বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। জাতীয় দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) প্রতিবেদন এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৩.৪ শতাংশ, যা সংস্থাটির আগের পূর্বাভাসের চেয়ে যথাক্রমে ০.৫ এবং ১.২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। তবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ক্রমশ উন্নতি এবং সরকারি খাতের সংস্কার কার্যক্রম গতিশীল হলে ২০২৮ অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি আশা প্রকাশ করেছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে বিশ্বব্যাংক বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাকে সরাসরি দায়ী করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের চরম দুর্বলতা বিনিয়োগ ও সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি যুক্ত হয়ে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে তুলছে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যা ৩০.৬ শতাংশ ছিল, তা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশে আটকে থাকায় সরকারি ব্যয় সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে, যার ফলে ২০২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
অর্থনৈতিক এই স্থবিরতার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও কঠিন প্রভাব পড়েছে দেশের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অনেকটাই থমকে গেছে এবং নারীরা উল্লেখযোগ্য হারে কাজ হারিয়েছেন। এর ফলে ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। যদিও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, জ্বালানি ও কৃষি খাতের ভর্তুকি দরিদ্রদের কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে, তবে এখনও দেশের প্রায় অর্ধেক হতদরিদ্র পরিবার এসব সুরক্ষা কর্মসূচির সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। এই নেতিবাচক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিদ্যমান খাদ্য ভর্তুকিগুলোকে একত্রিত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন করা গেলে তা অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
অর্থনৈতিক এই গভীর মন্দা কাটিয়ে ওঠে বেসরকারি বিনিয়োগভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিন পেসমে জানিয়েছেন, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ ও জ্বালানি খাতে জরুরি ভিত্তিতে জোরালো সংস্কার প্রয়োজন। তার মতে, অর্থনৈতিক পতন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় এই সংস্কারগুলো এখনই শুরু করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এই বিশাল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের বহিঃস্থ খাত, বিশেষ করে শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি সার্বিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির কারণ হিসেবে কাজ করছে।
‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনটি মূলত বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’-এর একটি অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এই আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার কারণে ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬.৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট এবং এশিয়া বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসোর্জ উল্লেখ করেছেন যে, এই অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও এটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকদের আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া থেকে শুরু করে বাংলাদেশে রেটিনাল স্ক্রিনিংয়ের মতো জনসেবামূলক কাজে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শ্রমশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সুযোগ সম্প্রসারণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

