বাংলাদেশের বেসরকারি খাত বিদেশ থেকে ধার নেওয়ার আগ্রহ স্পষ্টভাবেই হারিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৫.৯৫ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৯.৯৪ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ২৩ শতাংশের বেশি কম। কারণ হিসেবে উঠে আসছে তিনটি বিষয়: বিশ্বজুড়ে চড়া সুদহার, টাকার দামের বড় পতন এবং ডলারের সংকট। এই খবর শুধু ব্যাংকার বা অর্থনীতিবিদদের জন্য নয়। যে কারখানা বিদেশ থেকে যন্ত্র আনে বা কাঁচামালের দাম পরে মেটায়, তার খরচ ও ঝুঁকির সঙ্গে এই সংখ্যার সরাসরি সম্পর্ক আছে।
ধার ডলারে, আয় টাকায়: হিসাবের গোলমাল যেখানে
প্রথমে সুদের হিসাব দেখা যাক। বিদেশি ঋণের সুদ সাধারণত সোফর (SOFR) নামের একটি বৈশ্বিক বেঞ্চমার্কের সঙ্গে বাঁধা থাকে। ২০২১ সালে সোফর ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, ০.০৫ শতাংশ। ২০২২ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে হয় ১.৫০ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা ৫ শতাংশ ছাড়ায়, আর নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এটি ৩.৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ শীর্ষ থেকে কিছুটা নেমেছে, কিন্তু কয়েক বছর আগের তুলনায় এখনো অনেক ওপরে। এর ওপর ঋণদাতা ঝুঁকির জন্য আলাদা মার্জিন বসান, আর সুদের টাকা বিদেশে পাঠালে ২০ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয়। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, বিদেশি ঋণ এখন ৭ থেকে ৮ শতাংশ সুদে নিতে হচ্ছে, যা ২০২০ ও ২০২১ সালের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
কিন্তু সুদ আসলে অর্ধেক গল্প। ব্যবসায়ীদের আসল ভয়টা ডলারের দাম নিয়ে। যিনি ডলারে ধার নেন অথচ বিক্রি করেন টাকায়, তাঁর আয় এক মুদ্রায়, দেনা অন্য মুদ্রায়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে কারেন্সি মিসম্যাচ। মুদ্রা বিনিময়ের একটি মৌলিক তত্ত্ব, আনকভার্ড ইন্টারেস্ট প্যারিটি, বলে যে যে মুদ্রার সুদহার বেশি, সেই মুদ্রা সাধারণত ভবিষ্যতে দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বহন করে। ২০২৩ সালের শুরুতে যাঁরা ডলারপ্রতি ১০৫ টাকা দরে ঋণ নিয়েছিলেন, বছরের শেষে শোধ করতে গিয়ে তাঁদের বাজার থেকে ডলার কিনতে হয়েছে ১২০ টাকার বেশি দামে। এটা আমার নিজের হিসাব, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়, তবু ধরুন কেউ ১ হাজার ডলার ৮ শতাংশ সুদে নিলেন। এক বছর পর তাঁর দেনা ১ হাজার ৮০ ডলার, যা ১২০ টাকা দরে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ টাকা। শুরুতে ঋণের টাকা ছিল ১ লাখ ৫ হাজার। অর্থাৎ নামে ৮ শতাংশ হলেও টাকার হিসাবে খরচ বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। তাই আমার মতে, বিদেশি ঋণের সুদের হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই অর্ধেক ছবি দেখা, বাকি অর্ধেক হলো মুদ্রার ঝুঁকি।
ডলারের দাম কত বেড়েছে, আর সেটা কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০২২ সালের জানুয়ারিতে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলার ছিল প্রায় ৮৬ টাকা। এখন তা ১২২ টাকার আশপাশে। হিসাব করলে ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এর মানে যে ব্যবসা ডলারে ঋণ নিয়েছিল, তার টাকার অঙ্কের দেনা এই সময়ে সেই হারেই ফুলে উঠেছে, যদি না তার আয়ও ডলারে হয়। রপ্তানিকারকের কিছুটা সুরক্ষা আছে, কারণ তাঁর আয় ডলারেই আসে। কিন্তু যিনি দেশের বাজারের জন্য উৎপাদন করেন, যেমন সিমেন্ট, খাদ্য বা ভোগ্যপণ্য, তাঁর জন্য ঝুঁকিটা পুরোপুরি খোলা। ২০২৩ সালের শেষে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা এতটাই সতর্ক হয়েছিলেন যে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানিয়েছিলেন তাঁরা ডলারের দামের অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ঋণসুবিধাই ব্যবহার করছেন না।
সংখ্যাটা কমেছে, কিন্তু আসলে কোন অংশ কমেছে
এখানে একটা তথ্য আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। মোট ঋণ কমলেও সব অংশ সমানভাবে কমেনি। স্বল্পমেয়াদি ঋণ, যার মধ্যে আছে বায়ার্স ক্রেডিট ও আমদানির বিলম্বিত পেমেন্ট, ২০২২ সালের ১৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে এখন ১০.২১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৪২.৪৮ শতাংশ কম। ওই সময় মোট বেসরকারি বিদেশি ঋণের প্রায় ৬৮ শতাংশই ছিল স্বল্পমেয়াদি। এখন সেই অংশ নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। উল্টো দিকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ২০২০ সালের শুরুর ৪.৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৯.৭৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর একটা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা: স্বল্পমেয়াদি ঋণ বারবার নবায়ন করতে হয়, আর ডলারের বাজার অস্থির হলে নবায়ন কঠিন বা ব্যয়বহুল হয়ে যায়। তাই কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোবদ্ধ ঋণের দিকে সরে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালের তথ্যেও এই চাপের ছাপ আছে। ওই বছর বেসরকারি খাত স্বল্পমেয়াদি ঋণ পেয়েছিল ২৫.৮ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু শোধ করেছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৫.৩ বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ ঋণ কমার একটা বড় অংশ এসেছে নতুন ধার না নিয়ে পুরোনো ধার শোধ করে যাওয়া থেকে।
এটা কি শক্তির লক্ষণ, নাকি থমকে যাওয়ার?
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, বিদেশি দেনা কমা মানে ঝুঁকি কমা, আর সেটা ভালো খবর। আংশিক সেটা সত্যি, কারণ বিদেশি মুদ্রার দেনা কমলে মুদ্রার ঝুঁকি আর রিফাইন্যান্সিংয়ের চাপও কমে। কিন্তু সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করেছেন, একে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবসার শক্তি বাড়ার লক্ষণ ভাবা ঠিক হবে না। তাঁর মতে, এর পেছনে বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়া, ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়া, কিংবা আমদানি ও উৎপাদন কমে যাওয়াও থাকতে পারে। তিনি এটাও বলেছেন, কারণ নিশ্চিত করতে হলে নতুন ঋণ, পরিশোধ, বাণিজ্যিক ঋণ ও বিনিয়োগের আলাদা তথ্য দরকার। তাই আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না যে বিদেশি ঋণ কমার একমাত্র কারণ সুদ আর ডলারের দাম। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ভেতরেও ব্যবসার ঋণ নেওয়ার আগ্রহ ঐতিহাসিক নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪.৪৭ শতাংশে। ব্যাংকাররা এর জন্য কিছুটা উচ্চ সুদ, কিন্তু বিশেষ করে জ্বালানি সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপকে দায়ী করছেন। অর্থাৎ দেশি ঋণের চাহিদাও কম, বিদেশি ঋণের চাহিদাও কম, যা ইঙ্গিত দেয় সমস্যা শুধু ঋণের দামে নয়, বিনিয়োগের পরিবেশেও।
বিদেশি মুদ্রার বাজারের অবস্থা অবশ্য আগের চেয়ে স্থিতিশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬.৪২ বিলিয়ন ডলার, আর আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ৩১.৬০ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি, যেমন জুলাই মাসে, ছিল ২৯.৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিপিএম৬ হিসাবে এক বছরে প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। ফাহমিদা খাতুনের মতে, রিজার্ভ বাড়ছে ঠিকই, তবে তা যথেষ্ট নয়। আবার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ০.৫ শতাংশ কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করেছে, যা প্রায় ছয় বছরের মধ্যে প্রথম হ্রাস। দেশি ঋণ সস্তা হলে বিদেশি ঋণের আকর্ষণ আরও কমতে পারে, আবার ব্যবসা গতি পেলে নতুন ঋণের চাহিদাও বাড়তে পারে। এই দুই শক্তির কোনটি জিতবে, তা এখনই বলা কঠিন।
এরপর কী দেখা দরকার
আমার মতে, সামনের দিনগুলোতে তিনটি বিষয়ের দিকে নজর রাখা দরকার। প্রথমত, সোফর নামতে থাকলে বিদেশি ঋণের খরচ কমবে, কিন্তু সেটা তখনই কাজে আসবে যখন ডলারের দাম স্থির থাকবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যাবে নতুন ঋণ নেওয়া আর পুরোনো ঋণ শোধ করার আলাদা হিসাব, কারণ শুধু মোট ঋণ দেখে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ। তৃতীয়ত, সরকারি খাতেও বিদেশি অর্থায়ন কমছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উৎস থেকে এসেছে মাত্র প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৬১ শতাংশ কম। অর্থাৎ বেসরকারি ও সরকারি দুই দিক থেকেই বাইরের অর্থের প্রবাহ ধীর। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীদের বিদেশি ঋণ থেকে সরে আসা তাদের সতর্কতার প্রমাণ, কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেশের বিনিয়োগ আর প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সতর্ক সংকেতও।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

