চলতি বছরে দেশের শেয়ারবাজারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তারল্য সংকট—এমনটাই মনে করছেন বাজার–সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ পরিচালিত ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট সেন্টিমেন্ট সার্ভে–২০২৬’-এ অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এ চিত্র তুলে ধরেছেন। জরিপে প্রায় ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে প্রায় ২৩ শতাংশ বলেছেন, তারল্য সংকট বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অর্থাৎ দুই বিষয় মিলিয়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী এই দুটি কারণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে দেখছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে মোট ১০১ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগ ব্যাংকার, বিদেশি বিনিয়োগকারী, ট্রেডার, করপোরেট নির্বাহী, শিক্ষার্থী এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়েও জরিপে গুরুত্বপূর্ণ মতামত উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ মনে করেন, রাজনীতি, সুশাসন ও সামাজিক অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এছাড়া প্রায় ২৬ শতাংশ সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের অস্থিরতাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখেছেন।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়েও মিশ্র ধারণা পাওয়া গেছে। প্রায় ৩০ শতাংশের মতে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৫ থেকে ৫.৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। অন্যদিকে ২৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী প্রবৃদ্ধি ৫.৫ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যে হতে পারে বলে মনে করেন।
জরিপ চলাকালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে থাকলেও পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে প্রায় ৫৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, নির্বাচন অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।
গত বছরের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রায় ৪৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, নীতিনির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা ও করব্যবস্থা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। চলতি বছরে কোন খাত বাজারে এগিয়ে থাকবে—এ প্রশ্নে প্রায় ৪৬ শতাংশ ব্যাংক খাতকে এগিয়ে রেখেছেন। এছাড়া প্রায় ১৮ শতাংশ ওষুধ খাত এবং ৯ শতাংশ বিমা খাতকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন।
বছর শেষে বাজারের সূচক কোথায় যেতে পারে, সে বিষয়েও ধারণা দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। প্রায় ২৮ শতাংশের মতে, প্রধান সূচক ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ পয়েন্টের মধ্যে থাকবে। আর ২৩ শতাংশ মনে করেন, এটি ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০ পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি অংশগ্রহণকারী সূচককে ৫,৫০০ থেকে ৬,৫০০ পয়েন্টের মধ্যে দেখছেন।
লেনদেনের ক্ষেত্রেও মাঝারি প্রবণতার পূর্বাভাস দিয়েছেন তারা। প্রায় ৭০ শতাংশের ধারণা, দৈনিক গড় লেনদেন ৪০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকবে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার সীমার মধ্যেই লেনদেন থাকার সম্ভাবনা দেখছেন। সার্বিকভাবে জরিপে উঠে এসেছে—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক প্রবাহ স্বাভাবিক না হলে শেয়ারবাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে পাওয়া কঠিন হতে পারে।

