দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানিগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০টিতে বিদেশিদের বিনিয়োগ রয়েছে, তাও খুব ছোট পরিসরে। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি থেকে বিদেশিরা সম্পূর্ণ বিনিয়োগ তুলে নিয়েছেন, আবার কোথাও বিনিয়োগ কমিয়েছেন—যা খাতটির প্রতি আস্থার সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যর্থতা বিমা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার অভাব এবং লভ্যাংশ প্রদানে অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে ঝুঁকি-রিটার্নের ভারসাম্য বিবেচনায় এই খাতকে তারা বিনিয়োগের জন্য অনুকূল মনে করছেন না।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগ থাকলেও তা নগণ্য মাত্রায় সীমাবদ্ধ। আবার কয়েকটি কোম্পানিতে বিদেশিরা পুরো বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এক-দুটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য বিনিয়োগ বাড়লেও সামগ্রিক চিত্রে নেতিবাচক প্রবণতাই স্পষ্ট। সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে একটি শীর্ষ বিমা কোম্পানিতে, যেখানে মোট শেয়ারের মাত্র ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ বিদেশিদের হাতে রয়েছে—যা বড় কোনো অংশ নয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন যেখানে আয়ের ধারাবাহিকতা থাকে, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকে এবং করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত থাকে। কিন্তু দেশের বিমা খাতে এসব মানদণ্ড পূরণে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, যা বিনিয়োগ ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
এছাড়া শেয়ারগুলোর লেনদেন কম হওয়াও একটি বড় সমস্যা। অনেক বিমা কোম্পানির শেয়ারে পর্যাপ্ত তারল্য না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারেন না। ফলে এ খাত তাদের কাছে আরও অনাকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বিমা খাতে মুনাফার ধারাবাহিকতা নেই এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের আয় অস্থিতিশীল। পাশাপাশি দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং গ্রাহক আস্থার অভাব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নেতিবাচক বার্তা দেয়। আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবও বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমা শিল্পে সবচেয়ে বড় সংকট হলো ইমেজ বা ভাবমূর্তির সমস্যা। বহু ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দাবি সময়মতো পরিশোধ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। একসময় শক্তিশালী ছিল এমন কিছু কোম্পানিও এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে, যা পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিসংখ্যানও এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকার দাবি উত্থাপিত হলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১০৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৬৫ শতাংশ দাবিই বকেয়া রয়েছে। সাধারণ বিমা খাতেও একই চিত্র, যেখানে বিপুল পরিমাণ দাবি অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এ অবস্থার প্রভাব সরাসরি পড়ছে গ্রাহকসংখ্যায়। গত আড়াই বছরে জীবন বিমার সক্রিয় পলিসি কমেছে ১০ লাখেরও বেশি, যা খাতটির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার বড় ইঙ্গিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কঠোর নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, গ্রাহকের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং করপোরেট সুশাসন জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় বিমা খাত থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আরও সরে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

