মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘায়িত অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও তা টেকসই হবে কি না—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা পুরোপুরি ফিরতে পারেনি এবং বাজারে দোলাচল অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে সূচকে বড় কোনো পরিবর্তন না হলেও খাতভিত্তিক চাপ ও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান বাজারকে স্থবিরতার কাছাকাছি রেখেছে।
গত সপ্তাহে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের সামান্য পতন হয়েছে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের সপ্তাহের তুলনায় ১ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ২৫৭ পয়েন্টে। নির্বাচিত বড় কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ কমেছে ১২ পয়েন্ট। অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক সূচকে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে, যা ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। সূচকের এই মিশ্র প্রবণতা মূলত বাজারে দিকনির্দেশনার অভাব এবং বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষমাণ মনোভাবকে প্রতিফলিত করে।
লেনদেনের ক্ষেত্রে বাজারে তুলনামূলকভাবে গতি ফিরে এসেছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় গড় দৈনিক লেনদেন প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে ৮১৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে এই লেনদেন বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাজার মূলধন তিন হাজার কোটি টাকার বেশি কমে যাওয়ায় বোঝা যায়, নতুন করে শক্তিশালী বিনিয়োগ প্রবাহ তৈরি হয়নি; বরং কিছু খাতে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের শেয়ারে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে। বিশেষ করে বড় মূলধনি শেয়ারগুলো বিক্রয়চাপের মধ্যে থাকায় সামগ্রিক সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও ভূমিকা রাখছে। ডলার প্রবাহ, সুদের হার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলেছে।
সূচকে পতনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে কিছু বড় ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার। ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে বিক্রয়চাপ বাজারের সামগ্রিক মনোভাবকে দুর্বল করেছে। বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ার নড়বড়ে হলে সাধারণত পুরো সূচকের ওপর তার প্রভাব দ্রুত পড়ে, এবারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
অন্যদিকে লেনদেনের দিক থেকে প্রকৌশল খাত শীর্ষে উঠে এসেছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ১৭ শতাংশ দখল করে রেখেছে। ওষুধ ও রসায়ন খাত দ্বিতীয় স্থানে এবং সাধারণ বিমা খাত তৃতীয় স্থানে অবস্থান করেছে। বস্ত্র ও ব্যাংক খাতও তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ ধরে রেখেছে। এটি ইঙ্গিত করে যে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট কিছু খাতে সীমিত আকারে সক্রিয় থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে বিস্তৃত আস্থা তৈরি হয়নি।
রিটার্নের দিক থেকে খাতভিত্তিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। সিরামিক খাতে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে, এরপর তথ্যপ্রযুক্তি ও সাধারণ বিমা খাত কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল। বিপরীতে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতেও চাপ অব্যাহত ছিল। এটি স্পষ্ট করে যে মৌলিক অর্থনৈতিক খাতগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সপ্তাহের শুরুতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও তা দ্রুতই মিলিয়ে যায়। বিশেষ করে ডিসেম্বর-শেষ হিসাব বছরের কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য মুনাফা প্রত্যাশায় কিছু কেনার চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার স্পষ্ট সংকেত না আসায় বিনিয়োগকারীরা আবারও সতর্ক অবস্থানে চলে যান। ফলে বাজারে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা কার্যকর হয়নি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সদ্য শেষ হওয়া প্রান্তিকের কোম্পানিগুলোর আয় ঘোষণা এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। এই অনিশ্চয়তার কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা নতুন অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে পর্যবেক্ষণমূলক কৌশল নিয়েছেন। সাধারণত এমন সময়ে বাজারে অস্থিরতা থাকে এবং বড় অগ্রগতি দেখা যায় না—বর্তমান পরিস্থিতিও সেই প্রবণতারই প্রতিফলন।
দেশের অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। প্রধান সূচক সামান্য কমলেও একটি সূচকে সামান্য উন্নতি হয়েছে। তবে সেখানে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বোঝা যায় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমে এসেছে। বাজার অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ অপেক্ষা করছে পরবর্তী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকেতের জন্য।
সব মিলিয়ে দেশের শেয়ারবাজার এখন একটি অনিশ্চিত ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ এবং করপোরেট আয়ের অপেক্ষা—এই তিনটি প্রধান বিষয় বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আপাতত বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে চলার কৌশল অনুসরণ করায় বাজারে বড় ধরনের উত্থান বা পতন—দুটিই সীমিত পরিসরে রয়ে যাচ্ছে।

