পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিরীক্ষায় অবহেলা, আর্থিক প্রতিবেদনে গুরুতর অসংগতি এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ব্রোকারেজ হাউজ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা হয়েছে। চলতি মাসে জারি করা একাধিক আদেশে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের গরমিল থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো ‘স্বচ্ছ’ প্রতিবেদন দিয়েছে। বিশেষ করে একটি বিমা কোম্পানির জমি ক্রয় ও স্থায়ী আমানত সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ে গুরুতর ঘাটতি ধরা পড়ে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এক বছরের জন্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশীদারকে দুই বছরের জন্য তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
একইভাবে একটি বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় সব সূচকে অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও তা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় আরেক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিন বছর এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে চলমান নিরীক্ষা কাজগুলো শেষ করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে বাজারে অস্থিরতা না তৈরি হয়।
পরবর্তী বছরগুলোর নিরীক্ষা পর্যালোচনায়ও একই ধরনের সমস্যা ধরা পড়ে। নগদ প্রবাহ ও শেয়ার আমানত সংক্রান্ত তথ্য গোপন এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপস্থাপনার কারণে আরেকটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অডিটর প্যানেল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশীদারকেও দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ড অনুসরণ না করার অভিযোগে আরও একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশীদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম পুঁজিবাজারে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করছে কমিশন।
অন্যদিকে, একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া শেয়ার কেনাবেচা এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না করাও গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ৫ লাখ এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখতে এ ধরনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে আইন অনুযায়ী আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরীক্ষা ও ব্রোকারেজ কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়। সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলো বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নজরদারি এবং কঠোর প্রয়োগই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

