শেয়ারবাজারে টানা চাপের মধ্যে বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো)। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৭ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাপ্তাহিক দরপতনের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতি, ধারাবাহিক লোকসান এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা শেয়ারদরে এই বড় পতনের অন্যতম কারণ হতে পারে।
সপ্তাহজুড়ে লেনদেন শেষে বেক্সিমকোর প্রতিটি শেয়ারের দাম নেমে এসেছে ৮০ টাকা ৩০ পয়সায়। আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে যার মূল্য ছিল ১১০ টাকা ১০ পয়সা। মাত্র পাঁচ কার্যদিবানের ব্যবধানে শেয়ারটির মূল্য ২৯ টাকা ৮০ পয়সা কমে যায়, যা শতাংশের হিসাবে ২৭ দশমিক ০৭ শতাংশ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে এত বড় পতন সাধারণত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রত্যাশার প্রতিফলন। বিশেষ করে যখন কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান বৃদ্ধি এবং সম্পদমূল্যের অবনতি দেখা যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকতে পারেন।
বেক্সিমকোর সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটির আর্থিক পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৭৮ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে যেখানে লোকসান ছিল মাত্র ৩ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসানের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে।
একই সময়ে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও কমেছে। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৮২ টাকা ৫৭ পয়সা। বাজারমূল্য এবং সম্পদমূল্যের এই ব্যবধানও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সে উল্লেখযোগ্য ওঠানামা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ওই বছরই শেয়ারপ্রতি ৪১ পয়সা লোকসান গুনতে হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে কোম্পানিটি ৭ টাকা ৯২ পয়সা শেয়ারপ্রতি আয় করেছিল। ফলে এক বছরের মধ্যে মুনাফা থেকে লোকসানে চলে যাওয়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ছিল ৯২ টাকা ৫৮ পয়সা। কিন্তু পরবর্তী ছয় মাসে সেটিও কমে ৮২ টাকার ঘরে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সম্পদমূল্যের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।
আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেক্সিমকো ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে সময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৭ টাকা ৯২ পয়সা। যদিও আগের বছরে এই আয় ছিল ১৪ টাকা ১ পয়সা। অর্থাৎ মুনাফা তখন থেকেই ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে লোকসানে রূপ নেয়।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কোম্পানির আয় কমে যাওয়া, সম্পদমূল্য হ্রাস পাওয়া এবং ধারাবাহিকভাবে দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফলে শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়লে বাজারদর দ্রুত নেমে যেতে পারে।
বেক্সিমকো দেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট গ্রুপের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে পরিচিত নাম। ১৯৮৯ সালে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ৩ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৯৪৩ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কোম্পানির রিজার্ভে রয়েছে ৭ হাজার ৫৯২ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের সংখ্যা ৯৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬২। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৩ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৩২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৩৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ শেয়ার।
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন, মুনাফায় প্রত্যাবর্তন এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সাম্প্রতিক দরপতনের প্রভাব আগামী দিনেও বিনিয়োগকারীদের আচরণে প্রতিফলিত হতে পারে। বর্তমানে বাজারের নজর থাকবে কোম্পানির পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদন ও ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার দিকে।

