দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের তুলনায় পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের অবদান এখনো খুবই সীমিত। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে, যা অর্থনীতির আকার বিবেচনায় অত্যন্ত কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের পুঁজিবাজারে ইস্যুকৃত মোট মূলধন ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ডলারে এর পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক-এর হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট স্থায়ী মূলধন গঠনের আকার ১৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সেই হিসাবে পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম।
অর্থনীতিতে উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন—যেমন অবকাঠামো, কারখানা, যন্ত্রপাতি—তার সামগ্রিক হিসাবই মূলত স্থায়ী মূলধন গঠন। এই বিশাল বিনিয়োগের তুলনায় পুঁজিবাজারের অবদান নগণ্য হওয়ায় অর্থনীতির ভারসাম্যে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থায়ন কাঠামো এখনো ব্যাংকনির্ভর। শিল্প খাতে বিপুল অর্থায়ন হচ্ছে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে, যা পুঁজিবাজারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। এতে একদিকে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বিকল্প উৎস তৈরি হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার কারণে ব্যাংক খাত ঝুঁকিতে পড়ছে। পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ সহজ হতো এবং খেলাপি ঋণের চাপও কমানো যেত।
তবে বাস্তবে পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আসার প্রবণতা কমে গেছে। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বাজার নিম্নমুখী থাকায় উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এছাড়া অতীতে আইপিও প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অর্থের অপব্যবহার এবং শেয়ার কারসাজির ঘটনাও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। ফলে ভালো মানের কোম্পানিও বাজারে আসতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারকে কার্যকর করতে হলে নীতিগত সংস্কার, প্রণোদনা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে ভারসাম্য রেখে অর্থায়নের একটি যৌক্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমেছে, এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে তা ঋণাত্মক অবস্থায় চলে গেছে। এতে বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় পুঁজিবাজার ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় প্রকল্প বা বিনিয়োগের জন্য শুধু ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সব মিলিয়ে, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

