দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না থাকা বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোকেও এবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ বা পিআইসি নামে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
প্রস্তাবিত এই কাঠামো কার্যকর হলে নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি মূলধন, আয়, ঋণ বা বাজার প্রভাব থাকা কোম্পানিগুলোকে পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হলেও তাদের জন্য বাড়বে তথ্য প্রকাশ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা।
বিধিমালার খসড়া অনুযায়ী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, ব্রোকারেজ হাউসসহ বড় আকারের সব সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই কাঠামোর আওতায় পড়বে। পাশাপাশি আর্থিক মানদণ্ডেও পিআইসি নির্ধারণ করা হবে। যেমন—নির্দিষ্ট সীমার বেশি পরিশোধিত মূলধন, বার্ষিক টার্নওভার বা ব্যাংক ঋণ থাকলেই সংশ্লিষ্ট কোম্পানি এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হবে।
বিএসইসি সূত্র জানায়, পিআইসি হিসেবে চিহ্নিত কোম্পানিগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক তথ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে এসব তথ্য সরকারি ডাটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নতুন বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, বড় কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে বাধ্য হবে। এর জন্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও, যোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার ইস্যু বা সরাসরি তালিকাভুক্তির মতো পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে, অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রবণতা বন্ধ করতে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা সীমিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমান নিয়মে অনেক কোম্পানি বিএসইসির অনুমোদন ছাড়াই মূলধন বাড়াতে পারে। নতুন বিধিমালায় সেই সুযোগ কমিয়ে মূলধন বৃদ্ধি ও শেয়ার ইস্যুর ক্ষেত্রে বিএসইসির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে অস্বচ্ছভাবে মূলধন বাড়ানোর প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কমিশন।
বিএসইসির কর্মকর্তারা বলছেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো শেয়ারবাজারের বাইরে থাকা বড় কোম্পানিগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা। এতে কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভালো মানের প্রতিষ্ঠান বাজারে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।
তাঁদের মতে, অনেক বড় ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শেয়ারবাজারে আসে না। পিআইসি কাঠামো চালু হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে পুঁজিবাজারের দিকে নিয়ে আসা সহজ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক মনে করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়বে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো কোম্পানিকে সরাসরি তালিকাভুক্ত না করে তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও আর্থিক ভিত্তি যাচাই করে ধাপে ধাপে বাজারে আনা উচিত।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও মনে করছেন, বিধিমালাটি বাস্তবায়নের আগে ইস্যুয়িং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, নিয়মগুলো যদি ব্যবসাবান্ধব হয়, তবে তা বাজারের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
বিএসইসি জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অংশীজনদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে এবং শিগগিরই জনমত আহ্বান করা হবে। কমিশনের আশা, নতুন এই কাঠামো কার্যকর হলে দেশের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

