বাংলাদেশে বহু প্রতীক্ষিত কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হতে দেরির পেছনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতাসহ একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি অনেক আগেই শেষ হলেও নীতিগত জটিলতা ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি পিছিয়ে গেছে।
রোববার রাজধানীতে আয়োজিত ‘কমোডিটি এক্সচেঞ্জ : সম্ভাবনা, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।
সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, সংস্থাটির প্রস্তুতি অনুযায়ী কমোডিটি এক্সচেঞ্জ দেড় থেকে দুই বছর আগেই চালু করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তন, নীতিমালার বারবার সংশোধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ বা ডেরিভেটিভ মার্কেট বহু পুরোনো ধারণা হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি এখনো নতুন। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি চালু করতে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়েছে। তার মতে, পাকিস্তানে প্রায় দুই দশক আগে এবং ভারতে তারও আগে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হয়েছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে এই বাজার গড়ে তুলতে দেরি হয়েছে মূলত কাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে।
তিনি আরও বলেন, দেশের পুঁজিবাজারের প্রযুক্তি অবকাঠামো এখনো অনেকাংশে বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিও বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। পাশাপাশি আলাদা ব্রোকারেজ কাঠামো গঠন এবং সংশ্লিষ্ট জনবল প্রশিক্ষণেও সময় লেগেছে।
অনুষ্ঠানে সিএসই চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান জানান, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর জন্য এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের মধ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম চালু করা সম্ভব হতে পারে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, শুরুতেই এটি পণ্য কেনাবেচার সরাসরি বাজার হিসেবে কাজ করবে না। প্রথম ধাপে এটি মূলত ফিউচার কনট্রাক্ট ও ক্যাশ সেটেলমেন্টভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চালু হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ দামের চুক্তিভিত্তিক লেনদেন করতে পারবেন, কিন্তু বাস্তব পণ্যের সরাসরি ডেলিভারি শুরু হবে না। পরবর্তী ধাপে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি হলে ফিজিক্যাল ডেলিভারি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে দেশের কৃষিপণ্য, জ্বালানি, ধাতু ও অন্যান্য পণ্যের বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন সুযোগ পাবেন। তবে এ ধরনের বাজার পরিচালনায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল এবং বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন পণ্য ও বিনিয়োগের বৈচিত্র্যের অভাব রয়েছে। কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু হলে বাজারে নতুন গতি আসতে পারে। তবে তা সফল করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

