ঢাকার মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোর বড় স্ক্রিনজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য—লাল দাগ আর পতনশীল সূচক। দেশের পুঁজিবাজারে টানা দরপতন ও অনিশ্চয়তায় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। সাময়িক উত্থান দেখা গেলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না, ফলে আস্থাহীনতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে বাজার।
বাজারে দীর্ঘদিন ধরে থাকা এক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা এখন অনেকেরই বাস্তবতা। কয়েক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে—এই প্রত্যাশাও এখন ভেঙে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারের এই সংকট কেবল শেয়ারের দরপতন নয়, বরং এটি একটি আস্থার সংকট। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ডলার চাপ এবং নতুন মানসম্মত কোম্পানির অভাব—সব মিলিয়ে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
একজন ব্রোকারেজ হাউস কর্মকর্তা জানান, একসময় মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। এখন সেই চিত্র অনেকটাই হারিয়ে গেছে। লেনদেনের শুরুতে কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও দিনের শেষভাগে প্রায়ই তা পতনে রূপ নেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ সরাসরি শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলছে। উচ্চ সুদহার বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকের দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে, ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সম্ভাবনাময় শেয়ারবাজার থেকে অর্থ সরে যাচ্ছে। একজন সাবেক নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের মতে, মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ দুর্বল। এর প্রভাবেই পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরছে না।
তিনি আরও বলেন, কেবল সূচক বাড়ানো বা অল্প সময়ের উত্থান দিয়ে বাজারে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও ধীরে ধীরে কমছে। কারণ তারা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা খোঁজে, যা এখনো নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে, বাজারে নতুন মানসম্পন্ন কোম্পানি বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব না আসাও সংকটকে আরও গভীর করেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন আইপিও না থাকায় বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। একজন বাজার বিশ্লেষকের মতে, শেয়ারবাজার মূলত একটি পণ্যের বাজারের মতো। ভালো কোম্পানি বা ‘ভালো পণ্য’ না থাকলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
আরেক বিশ্লেষক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শেয়ারের দাম বেড়েছে, তার অনেকগুলোর পেছনে শক্ত ভিত্তি নেই। ফলে জল্পনানির্ভর লেনদেন বাড়ছে, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করছে। উচ্চ সুদহারও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকে তুলনামূলক নিরাপদ ও উচ্চ রিটার্ন পাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প খাত দুর্বল হলে শেয়ারবাজারও শক্তিশালী হতে পারে না। কারণ বাজারের মূল চালিকাশক্তি হলো উৎপাদনশীল খাত ও কোম্পানির মুনাফা। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু পুঁজিবাজারের সমস্যা নয়; এটি পুরো অর্থনীতির কাঠামোগত চাপের প্রতিফলন। আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অর্থনীতির মৌলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

