দেশের শেয়ারবাজারে টানা দরপতনের ধারা আরও গভীর হয়েছে। সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসেও দেশের দুই শেয়ারবাজারে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও গতি হারিয়েছে বাজার। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট বাড়তে থাকায় বাজারে বিক্রির চাপ দীর্ঘ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১১ মে) লেনদেনের শুরুতে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও সেই ধারা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। প্রথম ঘণ্টা পর্যন্ত বেশিরভাগ শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে এরপর থেকেই বাজারে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। একের পর এক কোম্পানির শেয়ার দরপতনের তালিকায় চলে যায়। শেষ পর্যন্ত পতনের মধ্য দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দিন শেষে ১৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ১৮৯টির। অপরিবর্তিত ছিল ৫৭টির দর। গত সাত কার্যদিবসের মধ্যে ছয় দিনই বাজারে দরপতন হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমে গেছে। একই সঙ্গে আর্থিক খাত নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা, দুর্বল আস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে বাজারে ইতিবাচক ধারা তৈরি হচ্ছে না। ফলে সামান্য বিক্রির চাপেও সূচক নেমে যাচ্ছে।
ভালো মৌলভিত্তির এবং ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যেও পতনের প্রবণতা ছিল বেশি। এই শ্রেণির ৭৭টি কোম্পানির শেয়ার দর বাড়লেও ১০২টির দর কমেছে। অন্যদিকে মাঝারি মানের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩৫টির দাম বাড়লেও ৩৪টির কমেছে। লভ্যাংশ না দেওয়া ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও দরপতনের চিত্র ছিল স্পষ্ট। এই গ্রুপের ৫৩টি কোম্পানির শেয়ার কমেছে, বেড়েছে ৩৪টির।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। তালিকাভুক্ত ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৭টির ইউনিট দর কমেছে, বেড়েছে মাত্র ১০টির। বাকি ৭টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
দরপতনের কারণে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২০৫ পয়েন্টে। ডিএসই-৩০ সূচক কমেছে ৫ পয়েন্ট। শরিয়াহভিত্তিক সূচকও সামান্য নেমেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে বাজারে প্রায় সব ধরনের শেয়ারেই চাপ রয়েছে।
লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় কমেছে। সোমবার ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৭১৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ২১ কোটি টাকা কম। ধারাবাহিকভাবে লেনদেন কমে যাওয়াকে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের বড় লক্ষণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল মুন্নু সিরামিকের শেয়ারে। কোম্পানিটির ৩৬ কোটির বেশি টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং এবং তৃতীয় স্থানে ছিল বিডি থাই ফুড। এছাড়া লাভেলো আইসক্রিম, এপেক্স ফুটওয়্যার, স্যালভো কেমিক্যাল, আমান ফিড, আরডি ফুড, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরি ও মুন্নু ফেব্রিক্সও লেনদেনে শীর্ষ তালিকায় ছিল।
দাম বৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে ছিল এপেক্স ট্যানারি। কোম্পানিটির শেয়ার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। একই হারে বেড়েছে রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসের শেয়ারদর। এছাড়া সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, বিডি অটোকার, আমান ফিড এবং সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে।
অন্যদিকে দরপতনের শীর্ষে উঠে এসেছে সিএপিএম বিডিবিএল মিউচ্যুয়াল ফান্ড ওয়ান। এছাড়া ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচ্যুয়াল ফান্ড, আইসিবি গোল্ডেন জুবিলী মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ক্যাপিটেক গ্রোথ ফান্ড ও কয়েকটি বিমা কোম্পানির শেয়ারে বড় পতন হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক কমেছে ৩ পয়েন্ট। সেখানে ২০২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৮টির শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। বেড়েছে ৭৫টির। তবে এই বাজারে লেনদেন কিছুটা বেড়ে ২০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নজরদারি এবং ভালো কোম্পানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ না থাকলে দরপতনের চাপ সহজে কাটবে না। বিশেষ করে ধারাবাহিক কম লেনদেন বাজারের গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

