দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। করপোরেট সুশাসন জোরদার, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং কোম্পানির জবাবদিহি বাড়াতে নতুন করপোরেট সুশাসন বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এতে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, যা দেশের করপোরেট কাঠামোয় নতুন বার্তা দিচ্ছে।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পর্ষদে মোট পরিচালকের এক-পঞ্চমাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধান রয়েছে। নতুন খসড়ায় সেই হার বাড়িয়ে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা তিনজনের কম হতে পারবে না। অর্থাৎ, বড় কোম্পানিগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকা আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হতে যাচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অনেক তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা পরিচালক ও পরিবারের সদস্যদের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের মুখে রয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য কমে যায় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। নতুন বিধিমালায় স্বতন্ত্র পরিচালকদের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবকে তাই করপোরেট জবাবদিহি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খসড়া অনুযায়ী, একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে সর্বনিম্ন পাঁচজন এবং সর্বোচ্চ ২০ জন সদস্য থাকতে পারবেন। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি মূলধনি প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা হবে ১০। প্রতিটি কোম্পানির বোর্ডে অন্তত একজন নারী পরিচালক রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা নারী অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া উদ্যোক্তা ও পরিচালক পর্যায়ে শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন শর্ত আরোপ করা হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালক ছাড়া অন্য উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে কোম্পানির অন্তত ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকতে হবে। আবার স্বতন্ত্র ও নির্বাহী পরিচালক বাদে প্রত্যেক পরিচালককে ব্যক্তিগতভাবে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। এর মাধ্যমে বোর্ড সদস্যদের কোম্পানির প্রতি আর্থিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্বতন্ত্র পরিচালকদের যোগ্যতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও কড়াকড়ি আনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন স্বতন্ত্র পরিচালক তিন বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরে আরও এক মেয়াদে পুনর্নিয়োগ পেতে পারবেন। তবে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে পুনরায় নিয়োগের আগে অন্তত তিন বছরের বিরতি বাধ্যতামূলক থাকবে।
স্বতন্ত্র পরিচালক হতে হলে ব্যবসা, আইন, করপোরেট ব্যবস্থাপনা বা একাডেমিক খাতে কমপক্ষে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এ সীমা আট বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া উদ্যোক্তা পরিচালক, তাদের পরিবারের সদস্য কিংবা গত তিন বছরের মধ্যে কোম্পানির নির্বাহী পদে থাকা কেউ স্বতন্ত্র পরিচালক হতে পারবেন না। এর মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচালকদের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালায় করপোরেট তদারকি জোরদারে অন্তত তিনটি বিশেষায়িত কমিটি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলো হলো অডিট কমিটি, নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটি এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটি। আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই, পরিচালকদের যোগ্যতা নির্ধারণ, পারিশ্রমিক নীতি প্রণয়ন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—এসব কাজ এসব কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
অডিট কমিটিতে অন্তত তিনজন সদস্য থাকতে হবে এবং সবাইকে নন-এক্সিকিউটিভ পরিচালক হতে হবে। এ কমিটিতে অন্তত একজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে নমিনেশন ও পারিশ্রমিক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে একজন স্বতন্ত্র পরিচালককে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
খসড়ায় কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পদ একই ব্যক্তির হাতে রাখা যাবে না। অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নির্বাহী কার্যক্রমের মধ্যে পৃথকীকরণ নিশ্চিত করতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এছাড়া প্রতিটি কোম্পানিকে আলাদা কোম্পানি সচিব, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও কমপ্লায়েন্স প্রধান নিয়োগ দিতে হবে। একই ব্যক্তি সাধারণত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে একই পদে থাকতে পারবেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
লভ্যাংশ বিতরণে বিলম্ব ঠেকাতেও নতুন নির্দেশনা এসেছে। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত লভ্যাংশ পরিশোধ করতে হবে। আর তিন বছর ধরে অবিতরণকৃত অবস্থায় থাকা লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে স্থানান্তর করতে হবে।
করপোরেট সুশাসনের মান যাচাইয়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে প্রতি বছর চার্টার্ড সেক্রেটারি প্রতিষ্ঠান থেকে কমপ্লায়েন্স সনদ নিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে সামাজিক দায়বদ্ধতা নীতিমালা প্রণয়ন এবং বার্ষিক প্রতিবেদনে তার বাস্তবায়ন তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন বিধিমালার খসড়া বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে। বিশেষ করে দুর্বল করপোরেট শাসন, পরিবারকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং নজরদারি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

