বাংলাদেশের শেয়ারবাজার নিয়ে একটি প্রশ্ন বহু বছর ধরেই ঘুরেফিরে উঠে আসে— এত লোকসান, এত হতাশা, এত অভিযোগের পরও মানুষ কেন বারবার এই বাজারে ফিরে আসে? কেন একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী কয়েক লাখ টাকা হারানোর পরও আবার নতুন আশায় শেয়ার কেনেন? কেন বড় ধসের পরও ব্রোকারেজ হাউসের স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন হাজারো মানুষ?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বপ্ন, দ্রুত আর্থিক নিরাপত্তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সমাজের বাস্তব আর্থিক চাপ। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার গত তিন দশকে একাধিক বড় ধসের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ভয়াবহ ধসের স্মৃতি এখনো অনেকের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। এরপর ২০১০–১১ সালের সময়কালে তৈরি হওয়া বুদবুদ ও পরবর্তী ধস লাখো বিনিয়োগকারীর জীবনকে উল্টে দেয়। সেই ক্ষতির দাগ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নানা সময়ে সাময়িক উত্থান দেখা গেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্থিতিশীল আস্থা গড়ে ওঠেনি। এই সময়ে রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রদবদল এসেছে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ একই থেকে গেছে— “আমরা হারি, অন্য কেউ লাভ করে।”
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় বাস্তবতা হলো, এটি এখনো মূলত খুচরা বা ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের উন্নত বাজারগুলোতে পেনশন ফান্ড, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল কিংবা বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারকে একটি স্থিতিশীল ভিত্তি দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
এর ফলে বাজারের একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় আবেগ, গুজব এবং স্বল্পমেয়াদি মুনাফার প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে। অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী এমন সময়ে বাজারে প্রবেশ করেন, যখন কোনো শেয়ারের দাম ইতোমধ্যে অনেক বেড়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক গ্রুপ, অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ এবং ব্রোকারেজ হাউসের কথাবার্তা। নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণের বদলে অনেকেই এসব তথ্যের ওপর ভর করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ ও তথ্যসমৃদ্ধ অংশগ্রহণকারীরা অনেক সময় ঠিক সেই পর্যায়েই শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। পরে দরপতনের সময় কম দামে শেয়ার কিনে আবার বাজারে প্রবেশ করেন। এই প্রক্রিয়ায় বাজারে একটি ধারাবাহিক বাস্তবতা তৈরি হয়— কম জ্ঞান ও কম তথ্যসম্পন্ন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত ও অভিজ্ঞ অংশগ্রহণকারীদের হাতে সম্পদের স্থানান্তর ঘটে। এত ক্ষতির পরও সাধারণ মানুষ কেন শেয়ারবাজার ছাড়েন না—এই প্রশ্নটি বহুদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে আসে।
এর একটি বড় কারণ হলো বিকল্প বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা। ব্যাংকে আমানতের সুদ অনেক সময় মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে। জমি বা ফ্ল্যাট কিনতে প্রয়োজন হয় বড় অঙ্কের মূলধন। আবার ব্যবসা শুরু করাও অনেকের জন্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে শেয়ারবাজার এমন একটি জায়গা হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে তুলনামূলক কম অর্থ দিয়েও বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক দিক। মানুষ সাধারণত ক্ষতি সহজে মেনে নিতে চায় না। একজন বিনিয়োগকারী যখন পাঁচ লাখ টাকা হারান, তখন তার মনে প্রায়ই একটি ধারণা কাজ করে— “আরেকটু অপেক্ষা করলে হয়তো বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।” এই আশা তাকে বাজারে ধরে রাখে। পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক সময় নতুন করে বিনিয়োগ করে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এছাড়া বাজারে হঠাৎ উত্থানের গল্পও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। কোনো পরিচিত ব্যক্তি স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ লাভ করেছেন—এমন গল্প দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে “সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে” ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় দলবদ্ধ আচরণ বা হার্ড বিহেভিয়ার। যেখানে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণের চেয়ে অন্যের সিদ্ধান্তই অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো দুর্বল ও অকার্যকর কোম্পানির উপস্থিতি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে। এসব কোম্পানির অনেকেই নিয়মিত লভ্যাংশ দেয় না, সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করে না, আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে না কিংবা কার্যত প্রায় বন্ধ অবস্থায় পরিচালিত হয়। তবুও এসব কোম্পানির শেয়ার বাজারে লেনদেন অব্যাহত থাকে। কখনও কখনও এসব শেয়ার অস্বাভাবিকভাবে দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকাতেও উঠে আসে।
এগুলো অনেকটা ‘জম্বি কোম্পানি’—যাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলেও বাজারে তারা এখনও সক্রিয়ভাবে ঘুরে বেড়ায়। কম ফ্রি-ফ্লোট এবং সীমিত মূলধনের কারণে এসব শেয়ার সহজেই কারসাজির শিকার হয়। দাম দ্রুত বাড়িয়ে পরে বিক্রি করে দেওয়ার ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কৌশলের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
শুধু বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, সামষ্টিক অর্থনীতির চাপও শেয়ারবাজারকে দুর্বল করে তুলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব উৎপাদন ও সেবা খাতের কোম্পানিগুলোর আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে তালিকাভুক্ত উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ কোম্পানি হয় লোকসান করেছে, নয়তো আগের তুলনায় কম মুনাফা অর্জন করেছে। অনেক কোম্পানি আবার আর্থিক প্রতিবেদনই প্রকাশ করেনি। যেসব কোম্পানি নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না, তাদের অনেকেরই ব্যবসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, অতীত সময়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাজারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
হতাশা বাড়ছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে:
মতিঝিলের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে এখন প্রায়ই এক ধরনের নীরবতা দেখা যায়। বড় মনিটরে সূচকের ওঠানামা চললেও আগের মতো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহ আর দেখা যায় না।
একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বলেন, তিনি সাড়ে আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, যা এখন প্রায় তিন লাখ টাকার কাছাকাছি নেমে এসেছে। তার ভাষায়, সরকার পরিবর্তনের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে—এমন আশা ছিল। কিন্তু এখন আবার টানা দরপতন চলছে। তার আশঙ্কা, এই ক্ষতি আর কোনো দিন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।
এই অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। বাজারে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর হতাশা এখন প্রায় একই ধরনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে কি শেয়ারবাজার শুধু ক্ষতির জায়গা—এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সমস্যাটি শেয়ারবাজারের ধারণায় নয়; মূল সমস্যা বাজারের সুশাসন, কাঠামো এবং বিনিয়োগ সংস্কৃতির দুর্বলতায়।
একটি কার্যকর পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ বাড়ে। বিপরীতে শক্তিশালী পুঁজিবাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান দিতে পারে।
উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই ভারসাম্য তৈরি করেছে। প্রতিবেশী ভারতও প্রযুক্তিনির্ভরতা, তথ্যপ্রকাশ, মিউচুয়াল ফান্ড সংস্কৃতি এবং বিনিয়োগ শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা এসআইপি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।
বাংলাদেশে কী করা জরুরি: বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি—
১. দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: বছরের পর বছর লোকসান করা, আর্থিক প্রতিবেদন না দেওয়া বা কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আওতায় আনতে হবে।
২. বাজার নজরদারি জোরদার: কারসাজি শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত জরিমানা, লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা এবং আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. ব্রোকারেজ হাউসের জবাবদিহি: গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা, স্বচ্ছতা এবং তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত না হলে বাজারে আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। সাময়িক মুনাফার বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী ধরে রাখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
৪. মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সংস্কার: মাসিক পারফরম্যান্স, পোর্টফোলিও, ফি, নিট সম্পদমূল্য এবং ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করতে হবে। পেশাদার সম্পদ ব্যবস্থাপনা ছাড়া সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে না।
৫. বিনিয়োগ শিক্ষা: সবচেয়ে বড় ঘাটতি এখানেই। এখনও অনেক মানুষ শেয়ারবাজারকে দ্রুত ধনী হওয়ার জায়গা হিসেবে দেখে। অথচ সফল বিনিয়োগ মূলত দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণানির্ভর এবং ধৈর্যের বিষয়। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই আর্থিক শিক্ষা বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোতে বিনিয়োগ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত।
৬. নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম: কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, লভ্যাংশের ইতিহাস, ঋণের পরিমাণ, আয়ের প্রবণতা এবং খাতভিত্তিক তুলনা সহজভাবে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে গুজবনির্ভর বিনিয়োগ কমে আসবে।
শেয়ারবাজারে ঝুঁকি থাকবে—এটাই বাস্তবতা। তবে ঝুঁকি আর অনিয়ম এক বিষয় নয়। একটি সুস্থ বাজারে বিনিয়োগকারী জানবেন, তিনি লাভও করতে পারেন, ক্ষতিও হতে পারে; কিন্তু বাজারটি ন্যায্যভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এই বিশ্বাসটি থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ এখনও শেয়ারবাজার ছাড়েননি—এটাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এর অর্থ, মানুষের ভেতরে এখনো আশা আছে। তারা এখনো বিশ্বাস করতে চান, একদিন এই বাজার স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজার শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। এটি মানুষের সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন এবং দেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। আর সেই প্রতিষ্ঠানকে আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা এখন শুধু বিনিয়োগকারীদের নয়, পুরো অর্থনীতির স্বার্থেই জরুরি।
সিভি/এম

