পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) রিয়েল-টাইম নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত ও কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজারে কারসাজি, অস্বাভাবিক লেনদেন এবং অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করতে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে ডিএসইর সার্ভেইল্যান্স টিম এবং বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বাজার তদারকি ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে উভয় পক্ষ মতবিনিময় করেন।
বিএসইসি মনে করছে, আধুনিক ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা ছাড়া একটি সুশাসিত পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বিশেষ করে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের যুগে বাজার কারসাজি ও সন্দেহজনক লেনদেন অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল আকার ধারণ করে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি শনাক্ত করতে সক্ষম উন্নত সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
বৈঠকে ডিএসইর পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বাজার তদারকি জোরদারে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয়। সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক শেয়ারদর পরিবর্তন শনাক্তকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কেও কমিশনকে অবহিত করা হয়।
এ সময় বিএসইসি স্পষ্টভাবে জানায়, বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি, কৃত্রিম দরবৃদ্ধি কিংবা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা বরদাশত করা হবে না। এ জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বাজার কারসাজি। কিছু অসাধু গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো বা কমানোর চেষ্টা করে, যার ক্ষতির শিকার হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কার্যকর রিয়েল-টাইম নজরদারি থাকলে এমন কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা শুধু অনিয়ম শনাক্ত করার জন্য নয়, বরং বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন বিনিয়োগকারীরা দেখেন যে বাজারে প্রতিটি লেনদেন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তখন তাদের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
বৈঠকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং তথ্য বিশ্লেষণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে সন্দেহজনক লেনদেন আরও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ উভয়ই সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও বাজার কারসাজি ও অস্বাভাবিক লেনদেন নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি। এ কারণে নজরদারি ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে পুঁজিবাজার সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে শুধু নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই যথেষ্ট নয়; বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। আর সে লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, ডিএসইর নজরদারি কাঠামো আধুনিক ও শক্তিশালী করা গেলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে, কারসাজির সুযোগ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। ফলে দেশের পুঁজিবাজার একটি টেকসই ও জবাবদিহিমূলক ভিত্তির ওপর এগিয়ে যেতে পারবে।

