সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের পুঁজিবাজারে ব্যাপক বিক্রির চাপে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। দিনের শুরুতে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমে যাওয়ায় প্রধান সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে কমেছে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং মোট লেনদেনের পরিমাণ।
রোববার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরুর পর বাজারে কিছুটা আশাবাদী পরিবেশ দেখা যায়। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকায় সূচকও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শেষ ঘণ্টায় অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রিতে ঝুঁকে পড়লে বাজারের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। এতে দিনের শুরুতে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় থাকা অনেক কোম্পানি শেষ পর্যন্ত দরপতনের তালিকায় চলে যায়।
দিন শেষে ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৭১টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ২৯৮টির দর কমেছে। অপরিবর্তিত ছিল ২৭টির দাম। অর্থাৎ বাজারে প্রায় চারগুণ বেশি কোম্পানির শেয়ার দরপতনের মুখে পড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট, মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার কারণে বাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে সূচক ও লেনদেন—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
দরপতনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে প্রধান সূচকে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ২১ পয়েন্ট হারিয়ে ৫ হাজার ৬৩৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শরিয়াহভিত্তিক সূচকও কমেছে। তবে বড় মূলধনের নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে ডিএসই-৩০ সূচক সামান্য ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে দিন শেষ করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বাজারের সার্বিক চিত্র দুর্বল হলেও কিছু বড় কোম্পানির শেয়ারে এখনও ক্রয় আগ্রহ রয়েছে।
ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট ছিল। উচ্চ লভ্যাংশ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের শেয়ারদর কমেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে মাঝারি মানের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে ‘জেড’ শ্রেণিতে থাকা কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগ শেয়ারও দরপতনের শিকার হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও মূল্যহ্রাসের প্রবণতা ছিল প্রকট।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২ কোটি টাকার কিছু বেশি, যা আগের কার্যদিবসের তুলনায় প্রায় ১৯৫ কোটি টাকা কম। লেনদেন কমে যাওয়াকে বাজারে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ এবং অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনের লেনদেনে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল ওষুধ, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বন্দরসেবা এবং কিছু উৎপাদনমুখী কোম্পানির শেয়ারে। এর মধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সর্বোচ্চ লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ধরে রাখে। এছাড়া সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, রবি, এনসিসি ব্যাংক এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে মূল্যসূচক কমেছে এবং অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর পতনের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন কয়েকগুণ কমে যাওয়ায় বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সামনের দিনগুলোতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বাজারে নতুন অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে সূচকের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বড় মূলধনের কিছু প্রতিষ্ঠানে ক্রয় আগ্রহ বজায় থাকায় বাজার পুরোপুরি নেতিবাচক অবস্থায় চলে যায়নি বলেও তারা মনে করছেন।
সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের এই চিত্র পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব এবং অনিশ্চয়তার বার্তাই সবচেয়ে বেশি তুলে ধরেছে।

