দেশের পুঁজিবাজার পরিচালনায় বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের লেনদেন নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কারিগরি মাপকাঠি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা এখন থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) হাতে থাকবে। বাজারের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়, কার্যকর তদারকি এবং আন্তর্জাতিক মানের বাজার পরিচালনা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বুধবার অনুষ্ঠিত বিএসইসির এক হাজার ১৮তম জরুরি কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। সিদ্ধান্তের পরপরই এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে ২০২১ সালের ১৭ জুন জারি করা সার্কিট ব্রেকার-সংক্রান্ত আগের নির্দেশনা বাতিল করা হয়েছে।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, ডিএসই ও সিএসই নিজেদের প্রবিধান, নীতিমালা এবং পরিচালনাগত প্রয়োজন বিবেচনায় বাজার পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নির্ধারণ করতে পারবে। তবে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সঙ্গে সঙ্গে কমিশনকে অবহিত করতে হবে এবং বিনিয়োগকারীসহ বাজারসংশ্লিষ্ট সবার কাছে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
এখন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো টিক সাইজ, মার্কেট লট, ব্লক সাইজ, অর্ডার সাইজ, সমাপনী মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, সার্কিট ব্রেকার, সার্কিট ফিল্টার, মার্কেট প্রোটেকশন পার্সেন্টেজ, সূচক গণনার সময়সীমাসহ লেনদেন নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কারিগরি বিষয় স্বাধীনভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে। এসব বিষয় প্রতিদিনের লেনদেনের গতি, মূল্য ওঠানামা এবং বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিএসইসির মতে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা, স্বচ্ছ ও দক্ষ লেনদেন নিশ্চিত করা এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য, স্টক এক্সচেঞ্জগুলো বাজারের দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকায় তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, যা বাজার পরিচালনাকে আরও কার্যকর করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত পুঁজিবাজারে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এ ধরনের কারিগরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এতে বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া সম্ভব হয় এবং অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা বা কারসাজি মোকাবিলাও সহজ হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ সিদ্ধান্ত বাজার পরিচালনায় অধিকতর বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর জবাবদিহিও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সার্কিট ব্রেকার বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আগাম অবহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, প্রচলিত আইনের অধীনেই স্টক এক্সচেঞ্জের এ ধরনের ক্ষমতা রয়েছে। কমিশনের নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের সুযোগ আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন মাপকাঠি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান নিয়মেই লেনদেন চলবে। স্টক এক্সচেঞ্জগুলো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন বিধান কার্যকর হবে।
এদিকে একই কমিশন সভায় বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ট্রাস্টি চাইলে সম্পদ ব্যবস্থাপকের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজারের স্বার্থ বিবেচনায় অর্থবছর শেষে অর্জিত মুনাফা লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করে তা পুনরায় ফান্ডে বিনিয়োগের অনুমতি দিতে পারবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘমেয়াদে ফান্ডের সম্পদ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য রিটার্ন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে সূচক ও লেনদেন বৃদ্ধির মধ্যে বিএসইসির এ সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে নতুন ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার, কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করা হলে তবেই এর সুফল বাজার ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবেন।

