দেশের শেয়ারবাজারে উৎপাদন বন্ধ এবং আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার ঘিরে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত তিন মাসে এমন অন্তত ৪১টি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর দ্রুত কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বহু সাধারণ বিনিয়োগকারী।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, গুজব, কৃত্রিম চাহিদা এবং অসাধু চক্রের প্রভাবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতনের প্রবণতা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ নতুন কিছু পদক্ষেপ নিলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে স্থিতিশীল করতে আরও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার সক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যাচাই না করেই অন্যের পরামর্শ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু গোষ্ঠী নির্দিষ্ট কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে। পরে উচ্চ দামে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন নতুন বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানির শেয়ারে সাধারণত বড় ধরনের দ্রুত মুনাফার সম্ভাবনা কম থাকে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অথচ এসব কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় সেখানে বিনিয়োগের ঝুঁকিও অনেক বেশি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ উৎপাদন বন্ধ অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা ৬২টি কোম্পানির একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকার কোম্পানিগুলোর লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে অন্তত ৪১টির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে এমন মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণও জানানো হয়নি। এ কারণে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম অল্প সময়ের মধ্যে ১৮৫ শতাংশ থেকে ২৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে সেই দাম আবার কমতে শুরু করে। ফলে যাঁরা সর্বোচ্চ দামে শেয়ার কিনেছেন, তাঁদের বড় অংশ এখন লোকসানের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ারে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে যায়। পরে সেই মূল্য আবার কমতে শুরু করে। একই সময়ে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড এবং শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেডের শেয়ারেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্থানের পর ধারাবাহিক দরপতন হয়েছে।
এ ছাড়া দুলামিয়া কটন, আনলিমা ইয়ার্ন, এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, আজিজ পাইপস লিমিটেড, ইয়াকিন পলিমার, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক ইন্ডাস্ট্রিজ, সাফকো স্পিনিং, হামিদ ফেব্রিক্স, ইন্দো বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরিসহ আরও অনেক কোম্পানির শেয়ারেও স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। পরে এসব শেয়ারের দামও কমে যায়।
এ তালিকায় আরও রয়েছে অ্যাকটিভ ফাইন, আরামিট সিমেন্ট, খুলনা পাওয়ার, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, নিউ লাইন ক্লোথিং, নর্দান জুট, প্যাসিফিক ডেনিমস, রহিম টেক্সটাইল, আরএসআরএম স্টিল, সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক, বারাকা পাওয়ার, জিবিবি পাওয়ার, মেট্রো স্পিনিং, মিথুন নিটিং, জিলবাংলা, আল-টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সেন্ট্রাল ফার্মা, ঢাকা ডায়িং, ডরিন পাওয়ার, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল, ন্যাশনাল টি, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, তাল্লু স্পিনিং এবং জাহিন স্পিনিং লিমিটেড। এসব কোম্পানির শেয়ারেও একই ধরনের অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে।
বাজারে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা প্রকাশ করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন পর আবারও ‘রিয়েল-টাইম অ্যাকশন’ চালু করা হয়। এর আওতায় অস্বাভাবিক লেনদেন বা মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ার এক দিনের জন্য লেনদেন থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় আরও কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে সার্কিট ব্রেকারের সীমা নির্ধারণের স্বাধীনতা দিয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ শেয়ারের দৈনিক মূল্য পরিবর্তনের সীমা ১০ শতাংশ। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ও উৎপাদন বন্ধ কোম্পানির ক্ষেত্রে এই সীমা কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, এতে স্বল্পমেয়াদে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে শুধু মূল্য ওঠানামার সীমা কমিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ মূল সংকট রয়েছে কোম্পানিগুলোর দুর্বল আর্থিক ভিত্তি, অকার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকার মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে ভালো মানের নতুন কোম্পানির সংখ্যা এখনও সীমিত। অন্যদিকে শক্তিশালী অনেক কোম্পানির শেয়ারের মূল্য ইতোমধ্যে তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে দ্রুত মুনাফার সুযোগ কম। এই বাস্তবতায় কিছু বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। পাশাপাশি বিনিয়োগ শিক্ষা ও সচেতনতার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তাঁদের মতে, শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে হলে শুধু কারিগরি নিয়ন্ত্রণ নয়, উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বছরের পর বছর বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা প্রয়োজন হলে তালিকাচ্যুত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি বাড়ানো এবং বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে টেকসই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে গুজবনির্ভর বিনিয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, শক্তিশালী কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা সম্প্রসারণই দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করতে পারে।

