দেশের পুঁজিবাজারে টানা ইতিবাচক প্রবণতার ধারাবাহিকতায় নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে প্রধান মূল্যসূচক। প্রায় ২২ মাস পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৭০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন, অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সূচকের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি, লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারে ক্রয়চাপ বাড়ায় বাজারের সার্বিক পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক হয়েছে। দীর্ঘদিন পর বড় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ধীরে ধীরে বাজারে সক্রিয় হচ্ছেন। ফলে বিক্রির চাপ কমে চাহিদা শক্তিশালী হওয়ায় সূচক ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
সাপ্তাহিক লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহ শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৯১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৭৪৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২২ মাস পর সূচকটি আবারও ৫ হাজার ৭০০ পয়েন্টের ওপরে অবস্থান নিল। একই সময়ে ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ বেড়ে ২ হাজার ১৬২ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩১ পয়েন্ট বেশি। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচকও ২৫ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১৬৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে মোট ৩৯১টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট বন্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২৭২টির বাজারদর বেড়েছে, ৯০টির দর কমেছে এবং ২৯টির দর অপরিবর্তিত ছিল। এছাড়া ২১টি সিকিউরিটিজে কোনো লেনদেন হয়নি। ঊর্ধ্বমুখী কোম্পানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় বাজারের সামগ্রিক প্রবণতাও ইতিবাচক ছিল।
লেনদেনের গতি ছিল সপ্তাহটির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যা আগের সপ্তাহের গড় ৯৫২ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫০ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর লেনদেনে এমন বড় প্রবৃদ্ধি বাজারে নতুন অর্থ প্রবাহ এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রতিফলন।
সূচকের উত্থানে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বিএসআরএম, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক এবং সিটি ব্যাংকের শেয়ার। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে শক্তিশালী ক্রয়চাপ সূচককে আরও ওপরে তুলতে সহায়তা করেছে।
খাতভিত্তিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট লেনদেনের ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ নিয়ে বস্ত্র খাত শীর্ষ অবস্থানে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক খাতের অংশ ছিল ১২ দশমিক ২ শতাংশ। ওষুধ ও রসায়ন খাত ১১ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়ে তৃতীয়, সাধারণ বীমা খাত ১১ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ এবং প্রকৌশল খাত ১০ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
রিটার্নের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো করেছে পাট খাত। সপ্তাহজুড়ে এ খাতে গড় ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, সিরামিক খাতে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, বস্ত্র খাতে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে কেবল একটি বা দুটি খাত নয়, বরং একাধিক খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপ, লেনদেনের গতি বৃদ্ধি এবং মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাজারকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করছে। তবে এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সুশাসন জোরদার করা, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
শুধু ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ নয়, একই সময়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও। সপ্তাহ শেষে সিএএসপিআই সূচক ১ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ১৫ হাজার ৪০৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসসিএক্স সূচকও ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ৪৩৭ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সপ্তাহজুড়ে ৩২৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ২১১টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৮৯টির কমেছে এবং ২৯টির দর অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ দুই পুঁজিবাজারেই ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারের সংখ্যা নিম্নমুখী শেয়ারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, সূচকের ২২ মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানো এবং লেনদেনের ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে এই গতি টেকসই করতে হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় বজায় থাকলে আগামী সপ্তাহগুলোতেও পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

