দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়টি ব্যাংক চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নয়টির মধ্যে সাতটি ব্যাংকই শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখাতে পেরেছে, আর বাকি দুটি ব্যাংকের আয় আগের তুলনায় কমে গেছে। বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
মুনাফা বৃদ্ধির তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো উন্নতি হয়েছে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের। এই ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় আগের বছরের এক টাকা ৩৪ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই টাকা ৫৫ পয়সায়, যা তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির হার। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সুদ থেকে আয় এবং বিনিয়োগজনিত আয় বাড়ায় এই উন্নতি সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির নগদ প্রবাহ পরিস্থিতি এবং শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্যও ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে।
আরেকটি ব্যাংক, যেটি রাষ্ট্রায়ত্ত ধারার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, তাদের ইপিএস আগের ৪৬ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে এক টাকা ১৭ পয়সা। এখানেও মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিনিয়োগ আয় ও ফি-কমিশন বাবদ আয়ের প্রবৃদ্ধি, সেই সঙ্গে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি বা প্রভিশন খাতে ব্যয় কমে যাওয়া।
মাঝারি আকারের দুটি বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির চিত্র লক্ষণীয়। একটির ইপিএস মাত্র ২ পয়সা থেকে বেড়ে ২৬ পয়সায় পৌঁছেছে, আর অন্যটির আয় ৮ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ পয়সায়। দ্বিতীয় ব্যাংকটি জানিয়েছে, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পারফরম্যান্স ভালো হওয়ার কারণে সার্বিক মুনাফা বেড়েছে, যদিও ঋণ বিতরণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ কিছুটা কমে গেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ইপিএস ৯৬ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে এক টাকা ১ পয়সা। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, বিনিয়োগ থেকে আয় বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারে করা বিনিয়োগের বিপরীতে রাখা সঞ্চিতি ফেরত পাওয়ার ফলেই এই উন্নতি ঘটেছে।
সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে একটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে, যারা আগের বছরের একই প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি এক টাকা ২৯ পয়সা লোকসানে ছিল, কিন্তু চলতি প্রান্তিকে তারা ১ পয়সা মুনাফায় ফিরতে সক্ষম হয়েছে। শুধু একক প্রান্তিক নয়, বছরের প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক হিসাবেও ব্যাংকটি লোকসান কাটিয়ে মুনাফার ধারায় প্রবেশ করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সবার জন্য খবরটি সুখকর নয়। একটি ব্যাংকের ইপিএস আগের ১৮ পয়সা থেকে কমে নেমে এসেছে মাত্র ১ পয়সায়। ব্যাংকটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিনিয়োগ আয়, কমিশন আয়, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে আয় এবং ব্রোকারেজ ব্যবসা থেকে আয়—এই সবগুলো খাতেই আয় কমে গেছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আমানতের বিপরীতে মুনাফা প্রদানের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক পরিচালন মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সবচেয়ে দুশ্চিন্তার তথ্য এসেছে একটি ইসলামি ধারার ব্যাংক থেকে, যাদের শেয়ারপ্রতি লোকসান আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ পয়সায়, যেখানে আগের বছর একই সময়ে লোকসান ছিল ২৮ পয়সা। শুধু লোকসানই নয়, ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ এবং শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য—উভয় সূচকেই আরও অবনতি লক্ষ্য করা গেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আর্থিক চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
আর্থিক প্রতিবেদনের বাইরে করপোরেট সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত দুটি পৃথক ঘোষণাও এসেছে। মুনাফা বৃদ্ধি পাওয়া ব্যাংকগুলোর একটির পরিচালনা পর্ষদ আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ভার্চুয়াল মাধ্যমে তাদের ১২তম বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সভায় প্রতিষ্ঠানের গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদ সংক্রান্ত ধারা সংশোধনের একটি প্রস্তাব শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।
অন্যদিকে, লোকসান থেকে মুনাফায় ফেরা ব্যাংকটির আগামী ২০ আগস্ট নির্ধারিত ১৩তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করা হয়েছে। নতুন তারিখ, সময় ও স্থান পরবর্তীতে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যাংক খাতের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই মুনাফা বৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে পেরেছে, যেখানে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বিনিয়োগ আয়ের প্রবৃদ্ধি এবং প্রভিশন বা সঞ্চিতি খাতে সাশ্রয়। তবে দুটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে আয় কমে যাওয়া এবং লোকসান বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতা বাজার বিশ্লেষকদের কাছে সতর্কতার সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বিশেষত আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ও ব্রোকারেজ খাতে আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকলে তা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

