দেশের শেয়ারবাজারে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো দরপতন হয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও নেমে এসেছে গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বাজারে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাবক না থাকায় বিক্রির চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দিনের লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ৩ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৬৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সূচকের দৈনিক পতন তুলনামূলকভাবে সামান্য হলেও টানা ছয়টি অধিবেশনে ডিএসইর প্রধান সূচক কমেছে মোট ১২৫ পয়েন্ট।
এই ছয় দিনের পতনের ফলে দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা কমেছে।
বাজারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা কমে যাওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে লেনদেনে। বুধবার ডিএসইতে মোট ৭৩২ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।
আগের দিনের তুলনায় লেনদেন কমেছে ২৭ শতাংশ। একই সঙ্গে এটি গত মে মাসের পর ডিএসইতে সর্বনিম্ন লেনদেন।
বাজারে লেনদেন কমে যাওয়াকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণত বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের বদলে অপেক্ষা করার কৌশল নেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতেও সেই প্রবণতাই স্পষ্ট হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দিনের শুরু থেকেই শেয়ারে বিক্রির চাপ ছিল বেশি। একপর্যায়ে ডিএসইর প্রধান সূচক দিনের সর্বনিম্ন ৫ হাজার ৭৩৭ দশমিক ৪০ পয়েন্টে নেমে যায়।
এরপর কিছু বিনিয়োগকারী কম দামে শেয়ার কেনার সুযোগ নিতে এগিয়ে আসেন। ফলে দিনের মাঝামাঝি সময়ে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং প্রধান সূচক সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৮১২ দশমিক ১৫ পয়েন্টে উঠে যায়।
তবে এই পুনরুদ্ধার বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। শেষ ঘণ্টায় আবারও বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। ফলে দিনের শুরুতে তৈরি হওয়া ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
একটি বাজার পর্যালোচনায় এই পরিস্থিতিকে ক্রেতা ও মুনাফা তুলে নেওয়া বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র টানাপোড়েন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজারের সাম্প্রতিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসেবে শিল্পকারখানায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তালিকাভুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কোম্পানির আয়, মুনাফা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কার্যক্রমে।
এই কারণে শিল্প খাতের কোম্পানিগুলো নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদননির্ভর কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে বড় ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে—এমন কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। পরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে এ ধরনের ব্যাপক পদক্ষেপের বিষয়ে প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
এই বিষয়টি বাজারের স্বাভাবিক মনোভাবেও প্রভাব ফেলেছে বলে বাজার পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চলমান উদ্বেগ যুক্ত হওয়ায় দিনের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
তবে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে, শুধু একটি কারণ নয়; বরং একাধিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চাপ তৈরি করছে।
বুধবার ডিএসইতে মোট ১৯৮টি কোম্পানি ও তহবিলের দর কমেছে। বিপরীতে ১৪০টির দর বেড়েছে এবং ৬১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দরে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
অর্থাৎ বাজারের সামগ্রিক চিত্রে বিক্রেতারাই এগিয়ে ছিলেন। প্রধান সূচকের পতন মাত্র ৩ পয়েন্ট হলেও বাজারের ভেতরের চিত্র ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
এ কারণে সূচকের সামান্য পতনকে বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ কম দামে শেয়ার কেনার চেষ্টা করলেও বড় আকারের নতুন বিনিয়োগ এখনো দৃশ্যমান নয়।
দিনের মোট লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে বস্ত্র খাত। ডিএসইর মোট লেনদেনের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে।
এরপর সাধারণ বিমা খাতের অবদান ছিল ১২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রকৌশল খাতের ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে বেশি লেনদেন হওয়া মানেই সব খাতে দর বেড়েছে এমন নয়। বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা এবং শেয়ারের দামের গতিপথ—দুইটি বিষয় আলাদাভাবে দেখতে হয়।
খাতভিত্তিক সূচকে দিনের চিত্র ছিল মিশ্র। সিরামিক খাত সবচেয়ে বেশি ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর পরের অবস্থানে ছিল বিবিধ ও সেবা খাত।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় দরপতনের মুখে পড়েছে সিমেন্ট খাত। এ খাতের সূচক কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
এ ছাড়া পারস্পরিক তহবিল খাতে ০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং বস্ত্র খাতে ০ দশমিক ৬ শতাংশ দরপতন হয়েছে।
একক কোম্পানির মধ্যে রিজেন্ট টেক্সটাইলের শেয়ারের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ।
এ ছাড়া রিলায়েন্স ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ও রানার অটোমোবাইলসের শেয়ারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
অন্যদিকে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ দিনের সবচেয়ে বড় দরপতনের শিকার হয়েছে। কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। জিবিবি পাওয়ার ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন দেখা গেছে।
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও দিনের লেনদেনে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক ১৯ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৪৯৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচিত শ্রেণির সূচকও ৭ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৪৪৫ পয়েন্টে নেমেছে।
তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল লেনদেনের পরিমাণ। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন ৪৯ শতাংশ কমে মাত্র ৩৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
ডিএসইর টানা ছয় দিনের পতন বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কতার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। সূচকের পতনের পাশাপাশি লেনদেন কমে যাওয়া এবং বাজারে দরপতন হওয়া কোম্পানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়া—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাজারের দুর্বল অবস্থানকে তুলে ধরছে।
তবে ছয় দিনের পতনের পর বাজারের সূচক এখন তুলনামূলকভাবে নিচের স্তরে অবস্থান করায় কিছু বিনিয়োগকারী কম দামে ভালো কোম্পানির শেয়ার কেনার সুযোগ খুঁজতে পারেন। বুধবারের লেনদেনেও এমন কিছুটা প্রবণতা দেখা গেছে।
অন্যদিকে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে উৎপাদননির্ভর কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি বাজারে নতুন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো ইতিবাচক কারণ তৈরি না হলে লেনদেনের গতি দ্রুত বাড়বে কি না, সেটিও প্রশ্নের মধ্যে থাকবে।
সব মিলিয়ে, ডিএসইর বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সূচকের দৈনিক ওঠানামা নয়, লেনদেনের পরিমাণ, কোম্পানিগুলোর আয় ও উৎপাদন পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার গতিপথ—এসব বিষয়ই আগামী দিনের বাজারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

