সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। দিনভর বিক্রির চাপ বাড়তে থাকায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। এর মধ্যে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩৫৫টির দর কমেছে এবং ১৮টির দাম অপরিবর্তিত ছিল।
দিন শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৭৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৬৪৩ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ডিএসই-৩০ সূচক ১৪ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১৩০ এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১৬ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১২৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
শুধু সূচক নয়, কমেছে লেনদেনের পরিমাণও। সোমবার ডিএসইতে মোট ৬০১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে ১০৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
সোমবার লেনদেনের শুরুতে বাজারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ায় ডিএসইর প্রধান সূচক একপর্যায়ে প্রায় ১০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। একের পর এক প্রতিষ্ঠানের দর কমতে থাকায় বাজার দ্রুত নেতিবাচক হয়ে পড়ে।
শেষ পর্যন্ত সেই চাপ আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাজার। লেনদেনের শেষ পর্যায়ে বিক্রেতাদের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয় এবং বড় ধরনের পতন নিয়েই দিনের কার্যক্রম শেষ হয়।
বাজারের এমন বড় পতনের মধ্যেও কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যতিক্রম ছিল। ডিএসইতে দর বাড়ার তালিকায় থাকা ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, একমি পেস্টিসাইড, বেক্সিমকো, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, আইএফআইএল ইসলামীক মিউচুয়াল ফান্ড-১, সায়হাম টেক্সটাইল, আরএকে সিরামিক, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, অলটেক্স, হামি, ম্যারিকো, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স ও ইবনেসিনা।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক অবস্থান সামগ্রিক বাজারের পতনের চিত্র বদলাতে পারেনি। বিপুলসংখ্যক কোম্পানির দরপতনের বিপরীতে মাত্র ১৪টির মূল্যবৃদ্ধি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার চাপকেই সামনে এনেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জ্বালানি ও গ্যাস সংকট শেয়ারবাজারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পায়, তাহলে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে সতর্ক হয়ে শেয়ার বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।
এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুক্ত হওয়ায় বাজারে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমছে।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমানের মতে, জ্বালানি সংকট, শিল্প ও উৎপাদন খাতের অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে বাজারে এমন সংশোধন তৈরি হয়েছে।
ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৯১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২১টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৯টির দাম কমেছে এবং ১১টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ১৭৩ পয়েন্ট কমেছে। দিনটিতে সিএসইতে মোট ১৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এ বাজারে লেনদেন হয়েছিল ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক এই পতনকে শুধু এক দিনের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাজারে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই দরপতন কোথায় গিয়ে থামবে?
বাজার বিশ্লেষক আশিকুর রহমানের মতে, বড় ধরনের বিক্রি বা ‘সেল-অফ’ হলে শেয়ারের মূল্যায়ন অনেক ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় পর্যায়ে চলে আসতে পারে। তখন নতুন করে বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তার ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাজার ইতিমধ্যে দুই দফায় তলানি বা ‘বটম’ তৈরি করেছে। তাই নতুন করে বড় কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকট তৈরি না হলে আগের সর্বনিম্ন পর্যায়ে বাজার ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে অর্থনীতির মৌলিক সূচক, জ্বালানি সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা পরিস্থিতির ওপর। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

