বিশেষ বিশ্লেষণ
কোনো কোম্পানি যখন আইপিওতে (ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং) কিনবা অফার ফর সেল এ আসে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে একটাই ধারণা কাজ করে, কোম্পানিটি বাজার থেকে টাকা তুলছে, আর সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা বাড়াবে। ধারণাটা পুরোপুরি ভুল নয়, কিন্তু পুরো সত্যিও নয়। বাস্তবতা হলো, এই টাকার পুরোটা সবসময় কোম্পানির কোষাগারে যায় না। কখনো কখনো সেই টাকার একটা বড় অংশ চলে যায় কোম্পানির পুরোনো মালিক বা উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত পকেটে। কার কাছে টাকা যাচ্ছে, এই একটা প্রশ্নের উত্তর জানলেই একজন বিনিয়োগকারী বুঝে ফেলতে পারেন, তিনি আসলে কী কিনছেন এবং কেন কিনছেন।
ফ্রেশ ইস্যু বনাম অফার ফর সেল: আসল খেলাটা এখানেই
একটা আইপিও মূলত দুই ধরনের শেয়ার নিয়ে গঠিত হতে পারে। প্রথমটি হলো ফ্রেশ ইস্যু অর্থাৎ কোম্পানি একদম নতুন শেয়ার তৈরি করে বাজারে ছাড়ছে। এই নতুন শেয়ার বিক্রি করে যে টাকা আসে, সেটা সরাসরি কোম্পানির নিজের হিসাবে জমা হয়, আর কোম্পানি সেই টাকা কারখানা সম্প্রসারণ, ঋণ পরিশোধ বা কর্মমূলধন হিসেবে ব্যবহার করে। দ্বিতীয়টি হলো অফার ফর সেল বা বিদ্যমান শেয়ার বিক্রি। এখানে কোম্পানি নতুন কোনো শেয়ার তৈরি করে না, বরং প্রতিষ্ঠাতা, স্পনসর বা পুরোনো বিনিয়োগকারীরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারের একটা অংশ সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে দেন। এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর দেওয়া টাকা এক টাকাও কোম্পানির তহবিলে যায় না, পুরোটাই যায় সেই বিক্রেতা শেয়ারহোল্ডারের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে। তাই একটা আইপিওর প্রসপেক্টাসে “ইউজ অব প্রসিডস” বা টাকার ব্যবহার অংশটা পড়া এত জরুরি, এটাই বলে দেয় আপনার টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পাবলিক ইস্যু রুলস, ২০১৫-এর কাঠামো দেখলে। এই বিধিমালা অনুযায়ী আইপিওর ন্যূনতম আকার নির্ধারণ করা হয় কোম্পানির মোট মূলধনের ভিত্তিতে, এবং নিয়মে স্পষ্ট শর্ত আছে যে স্পনসর ও পরিচালকদের গোষ্ঠীকে আইপিও-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিতে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধরে রাখতে হবে, আর প্রতিটি পরিচালককে (স্বতন্ত্র পরিচালক ছাড়া) কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার নিজের নামে রাখতে হবে। এই শর্তটা নিছক কাগুজে নিয়ম নয়; এটা করপোরেট ফাইন্যান্সের একটা প্রতিষ্ঠিত নীতির প্রতিফলন, যাকে বলা হয় “স্কিন ইন দ্য গেম” বা এজেন্সি থিওরি। যুক্তিটা সহজ, উদ্যোক্তারা যদি সব শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যেতে পারতেন, তাহলে কোম্পানির ভবিষ্যৎ পারফরম্যান্স নিয়ে তাদের আর মাথাব্যথা থাকত না। কিন্তু নিয়ম করে তাদের একটা বড় অংশ শেয়ারে বেঁধে রাখা হয়, যাতে তাদের নিজেদের স্বার্থ আর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ একই দিকে থাকে।
তাহলে পুরোনো শেয়ারহোল্ডাররা কি লাভবান হন না?
এখানেই আরেকটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। ফ্রেশ ইস্যু পদ্ধতিতে আইপিও হলেও পুরোনো শেয়ারহোল্ডাররা একেবারে লাভের বাইরে থাকেন না, শুধু তাদের লাভটা আসে ভিন্ন পথে। আইপিওর আগে তাদের হাতে থাকা শেয়ার ছিল “কাগজে-কলমে সম্পদ”; তার কোনো বাজারমূল্য ছিল না, বিক্রি করাও ছিল কঠিন। তালিকাভুক্তির পর সেই একই শেয়ার হয়ে যায় তরল সম্পদ, যেকোনো ট্রেডিং দিনে যার একটা নির্দিষ্ট বাজারদর থাকে এবং যা চাইলেই বিক্রি করা যায়। অর্থনীতিতে একে বলে “লিকুইডিটি প্রিমিয়াম” অতরল সম্পদ যখন তরল হয়ে ওঠে, তখন তার প্রকৃত মূল্য বেড়ে যায়, যদিও ব্যবসার মৌলিক অবস্থা এক চুলও বদলায়নি। তাছাড়া পাবলিক লিস্টিং কোম্পানিকে একটা ব্র্যান্ড-বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দেয়, ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ হয়, ভবিষ্যতে আরও মূলধন তোলার পথ খোলে। এসবের সুফলও শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা অংশের ওপর।
প্রাইমারি মার্কেট বনাম সেকেন্ডারি মার্কেট: একটা সহজ উদাহরণেই পরিষ্কার
এই পুরো আলোচনাটা বুঝতে হলে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটের ফারাকটা মাথায় গেঁথে নেওয়া দরকার, আর এটা আসলে ততটাও জটিল নয় যতটা শোনায়। প্রাইমারি মার্কেট হলো সেই জায়গা, যেখানে একটা শেয়ার প্রথমবারের মতো জন্ম নেয় এবং বিক্রি হয়। আইপিও এই প্রাইমারি মার্কেটের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এখানে টাকার প্রবাহ হয় বিনিয়োগকারী থেকে ইস্যুকারীর দিকে (ফ্রেশ ইস্যু হলে কোম্পানির দিকে, অফার ফর সেল হলে বিক্রেতা শেয়ারহোল্ডারের দিকে)। কিন্তু একবার শেয়ারটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ বা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে গেলে, তারপর থেকে যত লেনদেন হয় (আজ এক বিনিয়োগকারী আরেকজনের কাছে শেয়ার বিক্রি করছেন, কাল তৃতীয় কেউ সেটা কিনে নিচ্ছেন) সবকিছুই ঘটে সেকেন্ডারি মার্কেটে। সেকেন্ডারি মার্কেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে যত টাকার লেনদেনই হোক না কেন, তার এক পয়সাও কোম্পানির তহবিলে যায় না, পুরো টাকাটা ঘোরে দুই বিনিয়োগকারীর মধ্যে। তাই কোনো শেয়ারের দাম যদি তালিকাভুক্তির পর দ্বিগুণ হয়ে যায়, তার মানে এই নয় যে কোম্পানি নতুন করে টাকা কামিয়েছে; তার মানে হলো, বিনিয়োগকারীরা একে অপরের কাছে বেশি দামে শেয়ার কেনাবেচা করছেন, লাভ-ক্ষতি পুরোটাই তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: কেন ভালো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে ভয় পায়
এই তত্ত্বগুলো নিছক পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটের সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র আছে। ২০২৪ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে একটিও নতুন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন পায়নি, যা বাজারের একধরনের স্থবিরতাকেই সামনে নিয়ে আসে। এর পেছনে বড় একটা কারণ হলো, ভালো ব্যবসা করা পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হতে অনাগ্রহী, কারণ তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়া নজরদারি এবং করপোরেট সুশাসনের শর্তগুলোকে তাদের ঐতিহ্যগত পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের জন্য হুমকি মনে করে। এখানেই আজকের আলোচনার সঙ্গে বাস্তবতার যোগসূত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরোনো মালিকরা জানেন, পাবলিক হওয়ার অর্থ শুধু টাকা তোলা নয়, বরং একটা নির্দিষ্ট অংশ শেয়ার নিয়ম করে বেঁধে রাখা, স্বচ্ছতার শর্ত মেনে চলা এবং লাখো ছোট শেয়ারহোল্ডারের কাছে জবাবদিহি করা। যে মালিক তার ব্যবসার ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চান, তার কাছে এই শর্তগুলো আকর্ষণীয় মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একজন সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য আসল শিক্ষা
তাহলে একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে এই পুরো বিশ্লেষণ থেকে কী নেওয়ার আছে? প্রথম কথা হলো, আইপিওতে টাকা ঢালার আগে প্রসপেক্টাসে “ইউজ অব প্রসিডস” অংশটা মনোযোগ দিয়ে পড়া দরকার। টাকাটা কোম্পানির সম্প্রসারণে যাচ্ছে, নাকি পুরোনো মালিকদের পকেটে, সেটা জানলে বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে অনেক স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। দ্বিতীয় কথা হলো, স্পনসর-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ারধারণের শর্তটা আসলে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার একটা কাঠামো; এটা যত কঠোরভাবে মানা হয়, প্রতিষ্ঠাতাদের স্বার্থ তত বেশি সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আর তৃতীয় কথা হলো, তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দাম ওঠা-নামা করাটা সম্পূর্ণ সেকেন্ডারি মার্কেটের ঘটনা, যেখানে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সের চেয়ে বাজারের চাহিদা-জোগানের প্রভাব অনেক সময় বেশি কাজ করে। এই তিনটা বিষয় মাথায় রাখলে আইপিও নিয়ে অনেক অতিরঞ্জিত উত্তেজনা এবং হতাশা; দুটোই এড়ানো সম্ভব, আর বিনিয়োগের সিদ্ধান্তটাও হয়ে ওঠে অনেক বেশি তথ্যনির্ভর ও পরিণত।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

