দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে পুঁজিবাজারে। রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেন শুরুর প্রথম ঘণ্টাতেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫ হাজার ৫০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে। সকাল ১১টায় সূচকটি ২১ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৩৯ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪৯৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এর আগে গত সপ্তাহেই ডিএসইএক্স ১৪৭ পয়েন্ট হারিয়ে তিন মাসের সর্বনিম্ন ৫ হাজার ৫১৫ পয়েন্টে নেমেছিল। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়াচ্ছে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শুধু কারখানার উৎপাদনই থামিয়ে দেয়নি, বরং কোম্পানিগুলোর খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। সারাদেশে অন্তত ৯০০ টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে পড়েছে, উৎপাদন কমেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। শিল্পপতিরা জানাচ্ছেন, গ্যাস না পেয়ে জেনারেটর ও বয়লারে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার খরচ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয় কমিয়ে দেবে, এই আশঙ্কাতেই বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। ডিএসইর পরিচালক মো. সাজেদুল ইসলাম বলেছেন, “রোববারের এই পতনের পেছনে বড় কোনো মৌলিক বা নীতি-সংক্রান্ত কারণ নেই, এটি মূলত আতঙ্কজনিত বিক্রির ফল।” তবে রয়্যাল ক্যাপিটালের গবেষণা প্রধান আকরামুল আলম মনে করছেন, জ্বালানি সংকট যেসব খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলছে, তাদের মধ্যে বস্ত্র, ওষুধ ও সিমেন্ট অন্যতম। এই খাতগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমলে আয় কমবে, আর আয় কমলে শেয়ারের দামও কমবে, এই সরল হিসাবই এখন বাজারে প্রভাব ফেলছে।
রোববার সকাল ১১টা পর্যন্ত ডিএসইর ২২৫টি শেয়ারের দাম কমেছে, বেড়েছে মাত্র ৯৩টির। লেনদেন হয়েছে মাত্র ১৭১ কোটি টাকার, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক কম। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই চিত্র, সিএএসপিআই ১৬ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৮৫০ পয়েন্টে এবং সিএসসিএক্স ৭ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৬৫ পয়েন্টে নেমেছে। গত সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা, দৈনিক গড় লেনদেন আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কমে ৫৫৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ডিএসইর বাজার মূলধন গত সপ্তাহে ৫ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা কমেছে। এনভয় টেক্সটাইলস ছিল সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া শেয়ার, এক ঘণ্টায় ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাব অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শিল্প খাতে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার উৎপাদন হারিয়ে যাচ্ছে। শিল্প প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বস্ত্র, ওষুধ, সিমেন্ট, সিরামিক ও প্লাস্টিক খাত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কালিয়াকৈর কারখানায় গ্যাস সংকটের আগে বয়লারে দৈনিক ৫০০ লিটার ডিজেল লাগত, এখন লাগছে ১০ হাজার লিটার, চাহিদা বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। এই বাড়তি খরচ কোম্পানির মুনাফার ওপর সরাসরি চাপ ফেলছে, আর সেই চাপই এখন শেয়ারবাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু জ্বালানি সংকট নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটও এখন বড় সমস্যা। গত সপ্তাহে ডিএসই ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) জরুরি বৈঠক করে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। ব্রোকাররা বলছেন, বাজার নিয়ে কিছু অপ্রত্যাশিত হস্তক্ষেপ এবং জ্বালানি সংকট একসঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, “সামগ্রিক বিনিয়োগকারী আস্থা এখন টালমাটাল। সব স্টেকহোল্ডারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বাজারকে স্বাভাবিক করতে।” ইবিএল সিকিউরিটিজের বিশ্লেষণ বলছে, জ্বালানি সংকট ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়চাহিদার কারণে বাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

