কোম্পানি ২০ শতাংশ বোনাস ঘোষণা করেছে, শুনলেই মনে হয় বিনা পয়সায় কিছু পাওয়া গেল। কিন্তু হিসাব খুলে বসলে দেখবেন, বোনাস পাওয়ার দিন আপনার মোট বিনিয়োগের মূল্য এক টাকাও বাড়ে না। তাহলে বিনিয়োগকারী আসলে পেলেন কী? বিষয়টা বোঝা জরুরি, কারণ আমাদের অনেকেই ঘোষণার খবর দেখে শেয়ার কিনি, আর রেকর্ড ডেটের পর স্ক্রিনে দাম কমতে দেখে ঘাবড়ে যাই।
হাজার শেয়ার বারোশো হলো, তবু আপনি ধনী হলেন না কেন?
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে সাধারণত শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা। ডিভিডেন্ডের হারও সাধারণত এই অভিহিত মূল্যের ওপর হিসাব করা হয়। যেমন, গ্রামীণফোন যদি ১০৫ শতাংশ অন্তর্বর্তী ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে, তার অর্থ প্রতি ১০ টাকার শেয়ারের বিপরীতে একজন শেয়ারহোল্ডার পাবেন ১০ টাকা ৫০ পয়সা। একইভাবে, ২০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেওয়ার অর্থ হলো, আপনার প্রতি ১০টি শেয়ারের বিপরীতে আপনি আরও ২টি নতুন শেয়ার পাবেন।
কিন্তু এখানে একটা বিষয় বোঝা জরুরি; বোনাস শেয়ার পেলেই আপনার বিনিয়োগের মোট মূল্য বেড়ে যায় না। ধরুন, আপনার কাছে ১ হাজারটি শেয়ার আছে এবং প্রতিটির বাজারদর ১০০ টাকা। তাহলে আপনার মোট বিনিয়োগের বাজারমূল্য ১ লাখ টাকা। এখন কোম্পানি ২০ শতাংশ বোনাস দিলে আপনার শেয়ারের সংখ্যা বেড়ে হবে ১ হাজার ২০০টি। কিন্তু শেয়ারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক্সচেঞ্জ সাধারণত বাজারদরও সমন্বয় করে। হিসাবটি হলো: আগের দামকে ১০০ দিয়ে গুণ করে, ১০০-এর সঙ্গে বোনাসের হার যোগ করে পাওয়া সংখ্যা দিয়ে ভাগ করতে হবে। অর্থাৎ, ১০০ × ১০০ ÷ ১২০ = প্রায় ৮৩ টাকা ৩৩ পয়সা।
এবার হিসাবটা মিলিয়ে দেখুন। আপনার হাতে আছে ১ হাজার ২০০টি শেয়ার, প্রতিটির সমন্বয় করা তাত্ত্বিক দাম প্রায় ৮৩ টাকা ৩৩ পয়সা। সব মিলিয়ে বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ টাকা; আগের মতোই। পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি এবং এফটিএসই রাসেলের সূচক গণনার নিয়মেও একই মূলনীতি কাজ করে: নতুন শেয়ার যুক্ত হলে শেয়ারের দাম এমনভাবে সমন্বয় করা হয়, যাতে শুধু বোনাস দেওয়ার কারণে বিনিয়োগের মোট মূল্য কৃত্রিমভাবে বেড়ে না যায়।
বিষয়টি পিৎজার সঙ্গে তুলনা করলে আরও সহজে বোঝা যায়। আপনার পিৎজা আগে ৮ টুকরা ছিল, এখন সেটিকে ১২ টুকরা করা হলো। টুকরার সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু পিৎজার মোট আকার বাড়েনি। বোনাস শেয়ারও অনেকটা তেমন; শেয়ারের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু শুধু সেই কারণেই আপনার সম্পদের মূল্য বাড়ে না। এরপর বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের কারণে শেয়ারের দাম বাড়তেও পারে, কমতেও পারে; সেটি আলাদা বিষয়।
এটা নিছক কথার কথা নয়, এর পেছনে অর্থনীতির পুরনো তত্ত্ব আছে। ১৯৬১ সালে মিলার ও মডিগ্লিয়ানি দেখিয়েছিলেন, কোম্পানির বিনিয়োগ পরিকল্পনা একই থাকলে ডিভিডেন্ড নীতি কোম্পানির মূল্য বদলায় না। তবে শর্ত আছে, এটা নিখুঁত মূলধন বাজারের হিসাব। বাস্তবে কর, লেনদেন খরচ আর মনস্তত্ত্ব থাকে বলে হুবহু মেলে না। কিন্তু মূল কথাটা টিকে আছে: শুধু টুকরো বাড়ালে কেকের আকার বাড়ে না।
বোনাসের টাকাটা আসে কোথা থেকে?
বোনাসের টাকা মূলত আসে কোম্পানির জমানো মুনাফা থেকে, অর্থাৎ রিটেইনড আর্নিংস, থেকে অঙ্কটা নিয়ে পরিশোধিত মূলধনে যোগ করা হয়। কোম্পানির নিট সম্পদ বাড়ে না, শুধু মূলধনের খাতটা বড় হয় আর জমানো মুনাফার খাতটা ছোট হয়। বিএসইসি ২০২১ সালের আগস্টে এ নিয়ে কড়াকড়ি করেছে। বোনাস দিতে হবে সঞ্চিত মুনাফা বা রিটেইনড আর্নিংস থেকে, পরিশোধিত মূলধন কমিয়ে নয়, আর বোনাসের পর রিটেইনড আর্নিংস ঋণাত্মক হতে পারবে না। আইপিওর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তিন বছর পূর্ণ না হলে, কিংবা টানা দুই বছর অন্তত ১০ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড না দিলে, কমিশনের আগাম সম্মতি লাগে। বে লিজিং ২০২১ সালের জন্য ৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল, অথচ তাদের রিটেইনড আর্নিংস ছিল ঋণাত্মক। বিএসইসি সেই ঘোষণা বাতিল করে দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশনের সম্মতির পর রেকর্ড ডেট পাঁচ থেকে দশ কর্মদিবসের মধ্যে ঠিক হয়, আর রেকর্ড ডেটের ত্রিশ দিনের মধ্যে বোনাস শেয়ার বিও অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হয়।
লাভ প্রতি শেয়ারে কমে গেল, তাহলে কি ঠকলেন?
বোনাসের পর ইপিএস কমতে দেখে অনেকে ভাবেন কোম্পানির অবস্থা খারাপ। আসলে আন্তর্জাতিক হিসাব মানদণ্ড আইএএস ৩৩ এর ৬৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, বোনাস ইস্যু হলে আগের সব সময়ের ইপিএসও নতুন শেয়ারসংখ্যা ধরে নতুন করে হিসাব করতে হবে, যাতে তুলনা ঠিক থাকে। ধরুন আগের ইপিএস ছিল ৫ টাকা। ২০ শতাংশ বোনাসের পর সেটা দাঁড়ায় ৫ ভাগ ১.২, অর্থাৎ ৪ টাকা ১৭ পয়সা। শেয়ারও বেড়েছে, দামও সেই অনুপাতে কমেছে, তাই দাম আয়ের অনুপাতে কোনো পরিবর্তন আসে না। ক্ষতি যদি কোথাও হয়, সেটা হিসাবের এই অদলবদলে নয়।
আসল লাভের জায়গাটা অন্য, আর সেটাই লুকিয়ে আছে একটা শর্তে। ধরুন কোম্পানি ১০ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড দেয়, মানে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা। বোনাসের আগে ১ হাজার শেয়ারে আপনি পেতেন ১ হাজার টাকা। বোনাসের পর ১ হাজার ২০০ শেয়ারে একই হারে পাবেন ১ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু কোম্পানির দিক থেকে দেখুন। পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি থেকে ১২০ কোটিতে গেলে, একই ১০ শতাংশ দিতে তার নগদ খরচ ১০ কোটি থেকে বেড়ে ১২ কোটি হয়। মুনাফা না বাড়লে হয় হার কমাতে হবে, নয়তো আয়ের আরও বড় অংশ বিলিয়ে দিতে হবে। আমার বিশ্লেষণ হলো, বোনাস শেয়ার আসলে একটা প্রতিশ্রুতি, বিনা মূল্যের উপহার নয়। প্রতিশ্রুতিটা ভালো হবে তখনই, যখন কোম্পানির আয় বাড়তি মূলধনকে টেনে নিতে পারবে।
নগদের বদলে কোম্পানি বোনাস শেয়ার দেয় কেন?
বোনাস শেয়ার দেওয়ার পেছনে সব সময় বিনিয়োগকারীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে না; অনেক সময় কোম্পানির নিজের আর্থিক প্রয়োজনও এর কারণ হয়। যেমন, ২০২১ সালে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৪ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল বেসেল থ্রি-এর মূলধনসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে। এর ফলে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন বেড়েছিল ৩১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। রূপালী ব্যাংকের ঘটনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ব্যাংকটির স্টক ডিভিডেন্ড বাতিল করেছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে সেটি অনুমোদন দেওয়া হয়, কারণ মূলধন ঘাটতি থাকলে ব্যাংক নগদ ডিভিডেন্ড দিতে পারে না। অর্থাৎ ব্যাংকের জন্য বোনাস শেয়ার অনেক সময় মূলধন বাড়ানোর একটি উপায়। আর বিনিয়োগকারীর কাছে যে শেয়ারগুলো ‘ফ্রি’ মনে হয়, সেগুলো আসলে কোম্পানির ভেতরে রেখে দেওয়া মুনাফারই একটি অংশ; যে টাকা নগদ হিসেবে হাতে না এসে শেয়ারের আকারে থেকে যায়।
এবার নগদ ডিভিডেন্ডের সঙ্গে তুলনা করুন। গ্রামীণফোন প্রতি শেয়ারে ১০ টাকা ৫০ পয়সা নগদ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এই টাকা সরাসরি বিনিয়োগকারীর হিসাবে জমা হয়; শেয়ারের সংখ্যা বা বাজারদর সমন্বয়ের কোনো হিসাব এখানে নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে বোনাস শেয়ার সব সময় খারাপ। কোম্পানি যদি নিজের কাছে রাখা মুনাফা এমন কোনো ব্যবসায়িক কাজে বিনিয়োগ করে, যেখান থেকে ভবিষ্যতে আরও বেশি আয় ও মুনাফা তৈরি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরও লাভ হতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, কোম্পানি সেই টাকা কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারছে।
কর আর বাজারের মেজাজ
কর নিয়ে এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা জরুরি। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, বোনাস শেয়ারকে ‘ডিভিডেন্ড’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ফলে বোনাস শেয়ার পাওয়ার সময় সেটিকে ডিভিডেন্ড আয় হিসেবে ধরে বিনিয়োগকারীর ওপর কর বসে না। তবে ধারা ২৩ অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি নগদ ডিভিডেন্ডের চেয়ে বেশি স্টক ডিভিডেন্ড দিলে, কিংবা নগদ ডিভিডেন্ড না দিয়ে শুধু স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে, ঘোষিত স্টক ডিভিডেন্ডের পুরো অঙ্কের ওপর কোম্পানিকে ১০ শতাংশ কর দিতে হয়। অর্থাৎ বোনাস শেয়ার পেয়ে বিনিয়োগকারীর হাতে সরাসরি করের বিল না এলেও, কোম্পানির জন্য এটি একটি ব্যয়। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, কোম্পানির এই বাড়তি খরচের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মালিকদের স্বার্থেও পড়তে পারে, যদিও বিনিয়োগকারীর হিসাবের খাতায় তা আলাদা করে চোখে পড়ে না। আর শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হলে তার ওপর করের হিসাব আলাদা; নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটি কর উপদেষ্টার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই ভালো।
বোনাস শেয়ার ঘোষণার পর শেয়ারবাজারে কী ঘটে, তা নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ওপর করা গবেষণায়ও একরকম ফল পাওয়া যায়নি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বোনাস ঘোষণার আশপাশে শেয়ারদরে উল্লেখযোগ্য অস্বাভাবিক রিটার্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর করা আরেকটি গবেষণায় ঘোষণার দিন এমন অস্বাভাবিক রিটার্নের প্রমাণ মেলেনি। বরং বোনাস ঘোষণার আগের কয়েক দিনে নেতিবাচক রিটার্ন দেখা গেছে, যেটিকে গবেষকেরা বিনিয়োগকারীদের অনুমাননির্ভর আচরণের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার ১৩৭টি কোম্পানির তথ্য নিয়ে করা অন্য একটি গবেষণায় ডিভিডেন্ড ঘোষণার ফলে বিনিয়োগকারীদের মূল্য বেড়েছে; এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষণাগুলো পুরোনো এবং নমুনাও সীমিত; তাই এগুলো থেকে সব কোম্পানির জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: বোনাস ঘোষণার খবরে শেয়ারের দাম বেড়ে গেলেই ধরে নেওয়া যায় না যে বোনাসের কারণে বিনিয়োগকারীর প্রকৃত সম্পদও বেড়েছে।
তাই পরেরবার কোনো কোম্পানির বোনাস শেয়ারের ঘোষণা দেখলে শুধু কত শতাংশ বোনাস দিচ্ছে, সেটি দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। বরং তিনটি প্রশ্ন করুন। প্রথমত, কোম্পানির নগদ প্রবাহ ও সঞ্চিত মুনাফার অবস্থা কেমন; বোনাস দেওয়ার পেছনে আর্থিক ভিত্তি কতটা শক্ত? দ্বিতীয়ত, শেয়ারের সংখ্যা বাড়ার পরও কোম্পানি কি আগের মতো ডিভিডেন্ড দেওয়ার মতো আয় ধরে রাখতে পারবে কিনা; তৃতীয়ত, নগদ ডিভিডেন্ড না দিয়ে বোনাস দেওয়ার কারণ কী; ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মূলধন ধরে রাখা, নাকি মূলধনসংক্রান্ত কোনো ঘাটতি সামাল দেওয়া? বোনাস শেয়ার দেওয়ার অর্থ অনেকটা এমন একটি প্রস্তাবের মতো: ‘তোমার প্রাপ্য মুনাফার টাকা এখনই নগদে না নিয়ে কোম্পানির ভেতরেই থাকতে দাও, আমি সেই টাকা ব্যবসায় খাটাব।’ প্রস্তাবটি বিনিয়োগকারীর জন্য কতটা ভালো ছিল, তার আসল উত্তর মিলবে পরবর্তী কয়েক বছরের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, মুনাফা এবং ডিভিডেন্ডের ধারাবাহিকতায়।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

