বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পণ্যভিত্তিক লেনদেনের নতুন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ছয়টি স্টক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানকে কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার হিসেবে নিবন্ধনের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। একই সঙ্গে চারটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের যাচাই করা ও এখনো নিষ্পত্তি না হওয়া দাবির বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিএসইসির ১ হাজার ৩৫তম জরুরি কমিশন সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তগুলো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্রোকার হিসেবে অনুমোদনের নীতিগত সম্মতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সোহেল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এনএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বি রিচ লিমিটেড, পিএইচপি স্টকস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের ভিত্তিতে এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিএসইসি জানিয়েছে, নিবন্ধন সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা অভিপ্রায়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত নিবন্ধন সনদ নয়; নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
কমোডিটি ডেরিভেটিভস হলো এমন আর্থিক চুক্তি, যার মূল্য নির্ভর করে সোনা, রুপা, কৃষিপণ্য বা জ্বালানির মতো পণ্যের দামের ওপর। এসব চুক্তির মাধ্যমে বাজারের অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দাম নিয়ে আগাম অবস্থান নিতে এবং দামের ওঠানামার ঝুঁকি সামলাতে পারেন। সিএসই দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে সোনা, রুপা ও অপরিশোধিত পাম তেলের মতো পণ্য নিয়ে চুক্তি চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে চাল ও গমের মতো কৃষিপণ্যও যুক্ত হলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা আগাম দামের ভিত্তিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এসব পণ্যের লেনদেন চালু করতে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও চুক্তির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
অন্যদিকে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে চারটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বাংকো সিকিউরিটিজ লিমিটেড, তামহা সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড। যাচাই শেষে যেসব দাবি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোর বিপরীতে তহবিলের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক যোগ্য বিনিয়োগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কতজন বিনিয়োগকারী এই সুবিধা পাবেন বা অর্থ পরিশোধ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে বিএসইসির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ নেই।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াধীন নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা ১২টি পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও পরিপালন নিয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। আর্থিক অবস্থা, নিট সম্পদের পর্যাপ্ততা এবং নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান মেনে চলার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো স্টক ব্রোকার প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ ব্রোকিং লিমিটেড ও এভিভা ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং মার্চেন্ট ব্যাংকার পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড ও প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। কমিশনের মূল্যায়নে এসব প্রতিষ্ঠানের নিট সম্পদ পর্যাপ্ত এবং কয়েকটি সূচকে তাদের অবস্থান সন্তোষজনক।
অন্যদিকে, সাতটি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক ঘাটতি পূরণ ও পুঁজিবাজারের বিধিবিধান পরিপালনের জন্য ২০২৭ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টক ব্রোকার প্রিমিয়ার লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেড ও পিএফআই সিকিউরিটিজ লিমিটেড; মার্চেন্ট ব্যাংকার আইএল ক্যাপিটাল লিমিটেড ও জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড; এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। এদিকে, এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডকে নিট সম্পদের ঘাটতি পূরণ ও বিধিবিধান পরিপালনের জন্য আগে থেকেই ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল।
সব মিলিয়ে বিএসইসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে একদিকে নতুন ধরনের পণ্যভিত্তিক লেনদেনের বাজার গড়ে তোলার প্রস্তুতি এগোচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের দাবি নিষ্পত্তি ও দুর্বল আর্থিক অবস্থায় থাকা সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে নিয়ন্ত্রক নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কমোডিটি ডেরিভেটিভস ব্যবস্থা বাস্তবে চালু হলে বাজারে দাম নির্ধারণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত তদারকি, স্বচ্ছ লেনদেন এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।

