মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করেছে, তখনো এশিয়ার নির্বাচিত শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতটি দেশের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রিটার্ন দিয়েছে। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে বাজারের দুর্বলতার লক্ষণও স্পষ্ট। লেনদেন কমেছে, আর অক্টোবরেও সূচকের নিম্নমুখী প্রবণতা থামেনি।
এই সাত মাসে ডিএসইএক্সের রিটার্ন ছিল ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এর চেয়ে ভালো ফল করেছে শুধু পাকিস্তানের শেয়ারবাজার, যেখানে রিটার্ন ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। বাকি পাঁচ দেশের বাজারে একই সময়ে ক্ষতি হয়েছে। মালয়েশিয়ায় রিটার্ন ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ভিয়েতনামে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ২, শ্রীলংকায় ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৩ এবং ভারতে ঋণাত্মক ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইন্দোনেশিয়ার, সেখানে বাজার নেমেছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
এই সময়ে জ্বালানি তেলের বাজার ছিল চরম অস্থির। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬১ ডলার। মার্চে তা লাফিয়ে উঠে যায় ১১৮ ডলারে। শুধু মার্চ মাসেই দাম বেড়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। পরে কিছুটা কমে সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়ায় ১০৪ ডলারে। তবু ডিসেম্বর থেকে সেপ্টেম্বর, এই নয় মাসে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে হুথিদের হামলার পর দাম আবার ১২ শতাংশ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বড় ঝুঁকির কারণ। জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও চাপে পড়ে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয় এবং বিভিন্ন খাতের কোম্পানির মুনাফায়ও প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তেও এর ছাপ পড়ার কথা। তবে শেয়ারবাজারের গতি শুধু তেলের দামে নির্ধারিত হয় না। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সুদের হার, কোম্পানির আয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সেপ্টেম্বর মাসের হিসাবেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো। ওই মাসে আঞ্চলিক বাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম পতন হয়েছে ডিএসইএক্সের, মাত্র দশমিক ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে শ্রীলংকার সূচক কমেছে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ভিয়েতনামে কমেছে ৩ দশমিক ৪৭ এবং পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। মালয়েশিয়ায় পতন ৪ দশমিক ৩৩, ভারতে ৫ দশমিক ৮২ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। মাস শেষে ডিএসইএক্স দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে।
কিন্তু সূচকের এই কম পতনকে পুরোপুরি স্বস্তির খবর বলা যাচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন আগের মাসের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে। একই সঙ্গে দর হারানো শেয়ারের সংখ্যাও বেড়েছে। এর অর্থ, সূচক তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমেছে এবং শেয়ারদরের সামগ্রিক প্রবণতাও দুর্বল ছিল। সূচক কম পড়লেও বাজারের ভেতরের শক্তি যে আগের মতো নেই, এটি তারই ইঙ্গিত।
অক্টোবরেও সেই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত আছে। সেপ্টেম্বর শেষে ৫ হাজার ৫৫০ পয়েন্টে থাকা ডিএসইএক্স ১৯ অক্টোবর লেনদেন শেষে নেমেছে ৫ হাজার ৪৫১ পয়েন্টে। অর্থাৎ এই সময়ে সূচক হারিয়েছে ৯৯ পয়েন্ট।
সব মিলিয়ে চিত্রটি মিশ্র। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাংলাদেশের বাজার ভালো করেছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে লেনদেনে ভাটা, দর হারানো শেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অক্টোবরের পতন বলছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। তেলের দামের অনিশ্চয়তা কাটার আগে এই আস্থা ফিরিয়ে আনাই বাজারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

