নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দের অর্ধেক প্রথম দিনেই বিক্রির সুযোগ দিতে চায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বিধিমালার খসড়ায় বিদ্যমান ৯০ দিনের লক-ইন তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বড় মুনাফার সুযোগ পাবেন। কিন্তু বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এতে শেয়ারের দামে কারসাজির ঝুঁকি বাড়বে এবং ক্ষতিতে পড়তে পারেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
বর্তমান নিয়মে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক বিক্রি করতে ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। পরের ২৫ শতাংশ শেয়ারে লক-ইন ১২০ দিন, আর বাকি ২৫ শতাংশে ১৮০ দিন। ২০২৫ সালের বিধিমালা অনুযায়ী এই ব্যবস্থা এখন চালু আছে।
নতুন খসড়ায় প্রথম ৫০ শতাংশ শেয়ারের লক-ইন পুরোপুরি তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পরের ২৫ শতাংশ শেয়ারে লক-ইন কমিয়ে ৬০ দিন এবং শেষ ২৫ শতাংশে ৯০ দিন রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেক শেয়ার বিক্রিতে কোনো অপেক্ষার সময় থাকবে না, আর বাকি অর্ধেকের জন্যও আগের চেয়ে কম সময় অপেক্ষা করতে হবে।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের দর নির্ধারণে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের একাংশ বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারের অর্ধেক দ্রুত বিক্রি করে দিলে তার প্রভাব সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়তে পারে। এই আশঙ্কাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম মনে করেন, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ পাওয়া শেয়ারে লক-ইন থাকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, বিশ্বের উন্নত শেয়ারবাজারেও বিভিন্ন মেয়াদে এ ধরনের বিধিনিষেধ আছে। বাংলাদেশের বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বিবেচনায় লক-ইনের মেয়াদ কমানো যেতে পারে। কিন্তু বরাদ্দের ৫০ শতাংশ পুরোপুরি লক-ইনের বাইরে রাখা ঠিক হবে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, লক-ইন তুলে দিলে দাম নিয়ে কারসাজির সুযোগ তৈরি হতে পারে, ঝুঁকিতে পড়বেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তাঁর ভাষ্য, অতীতেও লক-ইন না থাকার সুযোগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
লক-ইনের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেটি হলো নতুন কোম্পানির শেয়ারের প্রথম দিনের লেনদেনে সার্কিট ব্রেকার থাকবে কি না। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং বিধিমালায় একসময় তালিকাভুক্তির পর প্রথম দুই দিন শেয়ারের দামের ওপর কোনো মূল্যসীমা ছিল না। ২০২১ সালের ১৭ জুন বিএসইসির নির্দেশনার পর নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রেও সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হয়। ফলে আগের দিনের দরের তুলনায় দাম সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ওঠানামার সুযোগ রাখা হয়।
নতুন খসড়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে নতুন কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনে মূল্যসীমা কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এই অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার প্রথম দিনেই ইস্যু মূল্যের দুই-তিন গুণ দামে লেনদেন হওয়ার নজির আছে। প্রথম দিনে মূল্যসীমা না থাকলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা একই দিন অর্ধেক শেয়ার বিক্রির সুযোগ পেলে বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে শেয়ারের প্রকৃত সরবরাহ, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা ও লেনদেনের পরিস্থিতির ওপর দামের গতিপথ নির্ভর করবে।
খসড়ায় আরও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব আছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বরাদ্দের কোটা ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। তবে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আগের মতো ১০ শতাংশ কোটা বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। দুই পদ্ধতিতেই মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য ১০ শতাংশ শেয়ার বরাদ্দের ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাঁদের অর্থ দ্রুত পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কোম্পানির শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিধিমালা এবং বাজার তদারকির কার্যকারিতার ওপর। খসড়া চূড়ান্ত করার আগে বিএসইসি এই উদ্বেগগুলো কতটা বিবেচনায় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

