পাঁচ দিনের টানা ছুটির পর আজ রবিবার খুলেছে ঢাকার শেয়ারবাজার। খোলার আগে থেকেই একটা প্রশ্ন ঘুরছে: বাজার কি তাহলে মরেই গেল? দৈনিক লেনদেন এখন ৪১০ কোটি টাকার ঘরে। কেউ বলছেন, এটা মরা বাজারের লক্ষণ। কেউ বলছেন, বাজার ঘুমিয়ে আছে,মরেনি।
এই নিম্ন লেনদেনের পেছনে কাঠামোগত কারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব, বিক্রেতার আধিপত্য নাকি সাময়িক ছুটি, ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ।
লেনদেন কমেছে কিন্তু আসল সংকট কি টাকার নাকি বিনিয়োগকারীদের ভরসার? বাজারে যাদের টাকা আছে, তারাই যদি নতুন করে বিনিয়োগে সাহস না পান তাহলে এই নীরবতা কি শুধু ছুটির প্রভাব, নাকি আরও গভীর কোনো সমস্যার ইঙ্গিত?
সংখ্যাটা আসলে কতটা ছোট?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ৭২২ কোটি টাকা। তার আগের বছর ছিল ৪৭২ কোটি। এক দিনের সর্বোচ্চ লেনদেন ১ হাজার ৫২৯ কোটি, সর্বনিম্ন ২৬৭ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে মোট লেনদেন আগের বছরের চেয়ে ৫৫ শতাংশ বেড়েছিল, প্রধান সূচক বেড়েছিল ২০ শতাংশ।
তাহলে ৪১০ কোটি টাকা গত অর্থবছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। তবে ওই বছরের সর্বনিম্ন দিনের চেয়ে বেশি। মানে বাজার এর চেয়েও নিচে নেমেছে, আবার উঠেছে।
আরও পেছনে তাকালে তুলনাটা কঠিন হয়। ডিএসইর সর্বকালের রেকর্ড একদিনের লেনদেন ৩ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা, ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর। সেদিনই তখনকার সূচক ৮ হাজার ৯১৮ ছুঁয়েছিল, তারপর ধস।২০২১ সালের আগস্টেও এক দিনে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৯৩৯ কোটি। সেই রেকর্ডের তুলনায় আজকের সংখ্যা প্রায় ১৩ শতাংশ।
এবার আর একটা হিসাব দেখা যাক। ২০২১ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি যেদিন সূচক তখনকার রেকর্ড ছুঁয়েছিল, সেদিন ডিএসইর বাজারমূলধন ছিল ৫ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা, লেনদেন ১ হাজার ৭৯৩ কোটি। ১৯ অক্টোবর বাজারমূলধন ৬ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকার বেশি, প্রায় ২৮ শতাংশ বড়। অথচ দৈনিক লেনদেন তখনকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। বাজার আকারে বেড়েছে, হাতবদল কমেছে।
আর একটা জিনিষ দেখা যাক, ১৪ অক্টোবর ডিএসইতে ৪১৬ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা ওই দিনের মোট বাজারমূলধনের মাত্র ০.১২ শতাংশ। অর্থাৎ, বাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ারের মোট মূল্যের তুলনায় এক দিনে হাতবদল হয়েছে প্রতি ১০০ টাকার বিপরীতে প্রায় ১২ পয়সার শেয়ার।
গত কয়েক সপ্তাহে আসলে কী ঘটেছে
বিডি নিউজ২৪ এর ভাষ্যমতে, ২০ সেপ্টেম্বর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছিল ৭৪৭ কোটি টাকা, যা এক মাসের সর্বোচ্চ। ২৭ দিন পর, ১৭ অক্টোবর, তা নেমে এসেছে ৩১৭ কোটিতে। প্রায় সাড়ে ৯ মাসের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন। এর আগে এর চেয়ে কম লেনদেন হয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর, ৩০৯ কোটি টাকা।
তবে ১৭ অক্টোবরের সংখ্যাটাকে নিখাদ আস্থার মাপকাঠি ধরলে ভুল হবে। পূজার ছুটি সমন্বয়ে সেদিন শনিবার বাজার খোলা ছিল। ডিএসই প্রথমবারের মতো কারওয়ান বাজারের ডিজাস্টার রিকভারি ডেটা সেন্টার ব্যবহার করে লেনদেন চালায়, আর প্রথম দিনেই বিঘ্ন ঘটে।
পরদিন শীর্ষ ১০ ব্রোকারেজ হাউসের তিনটি সারা দিন সংযোগ-সমস্যায় ছিল। ডিএসইর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা বলেছেন, সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে সময় লাগবে। তাই ওই দুই দিনের লেনদেনের কতটা আস্থার অভাবে আর কতটা প্রযুক্তির গোলযোগে, তা আলাদা করার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই।
গোলযোগের মধ্যেও ১৮ অক্টোবর লেনদেন ছিল ৩৬৫ কোটি, আর ১৯ অক্টোবর আবার ৫০২ কোটি। ১২ থেকে ১৯ অক্টোবরের সাত কার্যদিবসের গড় প্রায় ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪১০ কোটি হঠাৎ ধসে পড়া কোনো সংখ্যা নয়, গত কয়েক সপ্তাহের ধারারই অংশ।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের আর এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, ছুটির আগের তিন কার্যদিবসে মোট লেনদেন ছিল ১ হাজার ১৮৫ কোটি, গড় ৩৯৫ কোটি। এই সময়ে ডিএসইএক্স কমেছে মাত্র ১ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট, থেমেছে ৫ হাজার ৪৫০ দশমিক ৫৭-তে। কিন্তু একই সপ্তাহে দাম কমেছে ২১৩টি শেয়ারের, বেড়েছে ১২৬ টিতে। সূচক স্থির, ভেতরে অস্থির। ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ বেড়েছে, কারণ কিছু বড় শেয়ারে বাছাই করা কেনাকাটা হয়েছে।
নিস্তব্ধতার পেছনে একটা নয়, কয়েকটা কারণ
এক, আয় ও লভ্যাংশের অনিশ্চয়তা। জুনে হিসাব বছর শেষ করা কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণা চলছে। ইবিএল সিকিউরিটিজের সাপ্তাহিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, এই প্রকাশের মধ্যে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক হয়ে বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে। বাজার একটা সীমিত পরিসরে আটকে আছে।
দুই, জ্বালানি সংকট।বাজার-অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন ও ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে, মুনাফা ও লভ্যাংশে চাপ পড়ছে।
তিন, সুদের হারের টান।ফাইন্যান্সের একটা মৌলিক নীতি আছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগকারী চান ঝুঁকিহীন সম্পদের চেয়ে বেশি আয়। এই বাড়তি অংশটাই ঝুঁকির মূল্য।এবার সংখ্যাগুলো দেখুন। ১১ অক্টোবরের নিলামে ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিলের সুদহার নেমেছিল ৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর প্রথম ৮ শতাংশের নিচে। পরের নিলামে তা প্রায় ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশে উঠেছে বলে প্রকাশ করে দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশ।২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ (বিবিএস)। অর্থাৎ ঝুঁকিহীন বিনিয়োগেও প্রকৃত আয় প্রায় শূন্য।ওদিকে ডিএসইর গড় মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) আগস্টে ছিল ৮ দশমিক ৮৯। উল্টো করলে আর হিসাব করলে দেখা যায়, শেয়ারের আয়-প্রাপ্তি প্রায় ১১ শতাংশ । কাগজে-কলমে হিসাবটা শেয়ারের পক্ষে। তবু টাকা আসছে না কেন? পিই অতীতের আয়ের ওপর দাঁড়ানো সংখ্যা। জ্বালানি সংকটে ভবিষ্যৎ আয় কমলে ওই ১১ শতাংশও কমবে। বিনিয়োগকারীরা সম্ভবত এই অনিশ্চয়তারই দাম কষছেন। অন্যদিকে, গড়ের আড়ালে খাতভেদে ছবি আলাদা: আগস্টে ব্যাংকের পিই ছিল ৫ দশমিক ২১, বিমার ১৫ দশমিক ৩০, বস্ত্রের ১৬ দশমিক ৫৭ (ডিএসইর তথ্য, সিইআইসি)। কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন, বাজারে অতিমূল্যায়িত শেয়ার ঘিরে লেনদেনের প্রবণতা বেশি, অন্যদিকে মৌলভিত্তি ভালো এমন শেয়ার বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত মনোযোগ পাচ্ছে না।
চার, ছোট হয়ে আসা অংশগ্রহণকারীর বৃত্ত।সিডিবিএলের তথ্যে ২০২৬ সালের জুনের শেষে বিও হিসাব ১৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি। বছরের শুরুতে ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৫টি, জানুয়ারি-জুনে নতুন খুলেছে ৩৪ হাজার ৮৭৭টি। । কিন্তু ২০২৪ সালের শুরুতে হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার, আর ২০১০ সালে ৩৩ লাখের বেশি। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে বিও হিসাব ১ শতাংশেরও কম। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সক্রিয় বিনিয়োগকারী ২ লাখের বেশি নন। আর এক সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদেশিদের লেনদেনও দোদুল্যমান: ফেব্রুয়ারিতে ৬৬৩ কোটি টাকা, মে মাসে মাত্র ৭৪ কোটি, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে প্রায় ৪০০ কোটি ।
পাঁচ, নিয়ন্ত্রক কাঠামো আর প্রযুক্তির ধাক্কা।২০২২ সালের ২৮ জুলাই বিএসইসি সব শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস বসায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বেশির ভাগ কোম্পানি থেকে তা তোলা হয়। শেষ দুটি, বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংক, মুক্ত হয়েছে এ বছরের জুনে, চার বছরের ফ্লোর প্রাইস ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে। নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, ফ্লোর প্রাইস বাজারকে প্রায় দুই বছর অচল করে রেখেছিল। তিনি মার্জিন নীতি সহজ করা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর কথাও বলেছেন। অক্টোবরে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিধিমালার গেজেটও এসেছে। অর্থাৎ বাজার এখন মুক্ত দামে চলার চার মাসের মাথায়। সঙ্গে আছে ডেটা সেন্টারের গোলযোগ।
মৃত নাকি অপেক্ষায়, প্রমাণ কী বলে
মৃত বাজার মানে তিনটি জিনিস একসঙ্গে: দাম ধসে পড়া, নতুন মানুষ ও নতুন টাকা আসা বন্ধ আর বাজারে দামই নির্ধারিত না হওয়া।
এবার দেখা যাক, শেয়ারের দামের ওঠানামায় কী চিত্র দেখা যাচ্ছে।। ১১ থেকে ১৯ অক্টোবরের আট কার্যদিবসে ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৪০৪ থেকে ৫ হাজার ৪৫২ পয়েন্টের মধ্যে, মাত্র ৪৮ পয়েন্টের পরিসর। তুলনায় ১৩ সেপ্টেম্বর একদিনে সূচক পড়েছিল ৯৬ পয়েন্ট, ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সেদিন ৩৩৬টি শেয়ারের দাম কমেছিল, বেড়েছিল ২৭টির, আর লেনদেন ছিল ৫৭১ কোটি টাকা। আতঙ্কে বিক্রি হলে সাধারণত দাম আর লেনদেন দুটোই নড়বড়ে হয়ে যায়।
এখন দাম প্রায় স্থির, লেনদেন কম। এই সংমিশ্রণ আতঙ্কের চেয়ে দ্বিধার সঙ্গে বেশি মেলে। বিক্রেতারা তাড়াহুড়োয় নেই, ক্রেতারাও এগিয়ে আসছেন না।নতুন মানুষ ও টাকার দিকটা। এখানে ছবিটা মিশ্র।সিডিবিএলের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিও হিসাব বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। গত অর্থবছরে শেয়ারবাজারে লেনদেনও বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। তবে এসব ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কেনাবেচায় ওঠানামা বলছে, বাজার নিয়ে সবার আস্থা এখনো সমান নয়।
সংখ্যা নয়, সংকেত: কীসে বুঝব মোড় ঘুরছে
আমি পাঁচটি জিনিসের দিকে নজর রাখব:
নভেম্বর-ডিসেম্বরে আয় ও লভ্যাংশ ঘোষণার পর টানা কয়েক সপ্তাহ গড় লেনদেন গত অর্থবছরের গড় ৭২২ কোটির কাছাকাছি ফেরে কি না।
ট্রেজারি সুদহার ও মূল্যস্ফীতির গতিপথ, আর শেয়ারের আয়-প্রাপ্তির সঙ্গে তার ব্যবধান।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা স্থিতিশীল হয়।
ডিএসইর ডেটা সেন্টার সচল থাকে কি না। আগামী দুই মাস ডিআর কেন্দ্র ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি অংশগ্রহণ বাড়ে কি না।
বিএসইসি আইন, ১৯৯৩-এর উদ্দেশ্যই বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষা ও বাজারের উন্নয়ন। ফ্লোর প্রাইস তোলা, মার্জিন নীতি সহজ করার উদ্যোগ সেই পথেই। তবে এক পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষক দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশে লিখেছেন, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্কার দিয়ে তারল্য ফেরানো যায় না।এটা শুধু সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখার চেষ্টা, যাতে ৪১০ কোটি শুনে আতঙ্ক বা উল্লাস, কোনোটাই না করে আপনি নিজের হিসাবটা নিজে কষতে পারেন।
তাই ডিএসইর সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু সূচক বাড়ানো নয়, বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারীরা দরপতনের ভয়ে দূরে সরে না থেকে কোম্পানির প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। আপাতত বাজার মৃত নয়, তবে নিছক অপেক্ষায় থাকলেই যে প্রাণ ফিরবে, তার নিশ্চয়তাও নেই।
নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

