একটি কোম্পানি বছরের পর বছর লোকসান করছে, অথচ সেই কোম্পানির শেয়ার কিনতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, বাজার বুঝি উল্টাপাল্টা আচরণ করছে। কিন্তু শেয়ারবাজার শুধু আজকের লাভ দেখে না, দেখে ভবিষ্যতে কোম্পানিটি কত আয় করতে পারে। লোকসানি কোম্পানির শেয়ার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার পেছনে সাধারণত তিনটি কারণ থাকে। প্রথমত, ভবিষ্যতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির আশা, যাকে বলা হয় গ্রোথ এক্সপেক্টেশন। দ্বিতীয়ত, খারাপ অবস্থা কাটিয়ে কোম্পানির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা, অর্থাৎ টার্নঅ্যারাউন্ড। তৃতীয়ত, ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা থেকে শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়া, যার মধ্যে ফাটকামূলক বিনিয়োগের প্রবণতাও থাকে। এই তিনটি কারণের কোনোটিই নিজে থেকে ভালো বা খারাপ নয়। একই প্রত্যাশা থেকে কেউ অ্যামাজনের শেয়ারে বিনিয়োগ করে বহু গুণ লাভ করেছেন, আবার কেউ সব পুঁজি হারিয়েছেন। তাই লোকসানি শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কেন তৈরি হয়, আর সেই আকর্ষণের মধ্যে কোনটি সুযোগ আর কোনটি ঝুঁকি, সেটাই বোঝার চেষ্টা করব আজ।
লোকসান হচ্ছে, তবু শেয়ারের দাম বাড়ে কেন?
শেয়ারের ন্যায্য দাম নির্ধারণের একটি পুরোনো ধারণা হলো, ভবিষ্যতে কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য যত আয় করতে পারবে, আজকের দিনে সেই আয়ের মূল্য কত, তা হিসাব করা। জন বার্র উইলিয়ামস ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ে এই ধারণা ব্যাখ্যা করেন। এর পেছনের যুক্তি সহজ। আজকের এক টাকা আর পাঁচ বছর পরের এক টাকার মূল্য এক নয়। তাই ভবিষ্যতে যে আয় হবে, সেটিকে একটি নির্দিষ্ট হারে সমন্বয় করে বর্তমান মূল্যে হিসাব করা হয়। এই পদ্ধতির নাম ডিসকাউন্টিং।
এবার পিই রেশিওর কথা ভাবুন। শেয়ারের দামকে শেয়ারপ্রতি আয় দিয়ে ভাগ করলে এই অনুপাত পাওয়া যায়। কিন্তু কোম্পানির আয়ই যদি ঋণাত্মক হয়, অর্থাৎ কোম্পানি লোকসান করে, তাহলে এই অনুপাত দিয়ে শেয়ারের মূল্য বোঝা কঠিন। ফলে লোকসানি কোম্পানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের পরিচিত এই মাপকাঠিটি কার্যত কাজে আসে না। তখন তাঁরা নির্ভর করেন ভবিষ্যতে কোম্পানির আয় বাড়ার সম্ভাবনা ও অন্যান্য অনুমানের ওপর।
অ্যামাজনের উদাহরণটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৭ সালের ১৫ মে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে আসে, তখন প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১৮ ডলার। ২০০২ সালেও অ্যামাজনের নিট লোকসান ছিল ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এরপর ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো পুরো বছরে মুনাফা করে কোম্পানিটি। মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। একই সময়ে বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৫২৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রথমবার বার্ষিক মুনাফা করার আগেই বিনিয়োগকারীরা কয়েক বছর ধরে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর ভরসা করে এসেছেন।
এর পেছনে হিসাবের ধরনও ভূমিকা রাখে। গবেষণা ও নতুন পণ্য তৈরির খরচের বড় অংশ অনেক সময় যে বছর ব্যয় করা হয়, সেই বছরই খরচ হিসেবে দেখাতে হয়। অথচ এসব খরচের সুফল পাওয়া যেতে পারে পরবর্তী কয়েক বছরে। ফলে কোনো কোম্পানির লোকসানের একটি অংশ ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য করা বিনিয়োগের খরচও হতে পারে। তবে সব লোকসানই এমন নয়। কোন খরচ ভবিষ্যতে আয় বাড়াতে সাহায্য করবে আর কোনটি শুধু লোকসান বাড়াচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।
বাজার আসলে কোন জিনিসটার দাম দিচ্ছে?
এখানেই আসে গ্রোথ এক্সপেক্টেশনের বিষয়টি। স্টুয়ার্ট মায়ার্স ১৯৭৭ সালে দেখিয়েছিলেন, একটি কোম্পানির মূল্যকে মোটামুটি দুটি অংশে দেখা যায়। প্রথমটি হলো কোম্পানির বর্তমান সম্পদ ও ব্যবসার মূল্য। দ্বিতীয়টি হলো ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগের মূল্য। তিনি ভবিষ্যতের এই সুযোগগুলোকে বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নতুন ও লোকসানি কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ারের দামের বড় অংশই অনেক সময় এই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে।
ধরা যাক, একটি ডেলিভারি অ্যাপ বছরে ১০০ টাকা আয় করে, কিন্তু খরচ হয় ১২০ টাকা। অর্থাৎ তার লোকসান ২০ টাকা। এখন যদি প্রতি বছর আয় দ্বিগুণ হতে থাকে, অথচ খরচ একই হারে না বাড়ে, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যে কোম্পানিটি লোকসান থেকে মুনাফায় চলে যেতে পারে। বিনিয়োগকারীরা এই সম্ভাবনাটিই আগেভাগে শেয়ারের দামে বিবেচনা করেন। তবে আয় ও খরচের এই পরিবর্তন বাস্তবে ঘটবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অসওয়াথ দামোদারান এ ধরনের কোম্পানির মূল্যায়নে তিনটি বিষয় দেখতে বলেন। প্রথমত, কোম্পানির বিক্রি কত দ্রুত বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা পরিণত পর্যায়ে পৌঁছালে প্রতি ১০০ টাকা বিক্রি থেকে কত টাকা মুনাফা হতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কতটা অতিরিক্ত বিক্রি তৈরি করা সম্ভব। এর পাশাপাশি কোম্পানিটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে কি না, সেই ঝুঁকিও হিসাব করতে হয়।
নতুন কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রথম দিকে নগদ অর্থের প্রবাহ নেতিবাচক থাকতে পারে। এ কারণে মূল্যায়নের সময় ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি আয়ের ভিত্তিতে হিসাব করা মূল্য, যাকে টার্মিনাল ভ্যালু বলা হয়, বর্তমান মোট মূল্যায়নের ১০০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। সহজভাবে বললে, আজকের শেয়ারের দাম দাঁড়িয়ে থাকতে পারে বহু বছর পর কোম্পানিটি কত আয় করবে, সেই অনুমানের ওপর। এই হিসাব অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বা ব্যবসায় টিকে থাকার সম্ভাবনায় সামান্য পরিবর্তন এলেও শেয়ারের ন্যায্য মূল্য অনেকটা বদলে যেতে পারে। এ কারণেই এমন শেয়ারের দাম সাধারণত বেশি ওঠানামা করে।
ডুবন্ত জাহাজের টিকিট কেউ কেন কাটে?
লোকসানি কোম্পানির শেয়ার আকর্ষণীয় হওয়ার আরেকটি কারণ হলো টার্নঅ্যারাউন্ড। অর্থাৎ কোম্পানির বর্তমান অবস্থা খারাপ, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে। সেই পরিবর্তন আসতে পারে নতুন নেতৃত্ব, নতুন পুঁজি, ঋণ পুনর্গঠন কিংবা খরচ কমানোর মাধ্যমে।
১৯৯৭ সালের ৬ আগস্ট মাইক্রোসফট অ্যাপলে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। বিনিয়োগটি ছিল ভোটাধিকারহীন প্রেফারেন্স শেয়ারে। একই সঙ্গে মাইক্রোসফট অন্তত পাঁচ বছর ম্যাক কম্পিউটারের জন্য অফিস সফটওয়্যার তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয়। তখন স্টিভ জবস সদ্য অ্যাপলের নেতৃত্বে ফিরে এসেছেন। এর পরের বছরই বাজারে আসে আইম্যাক। অ্যাপলের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে অর্থায়ন, সফটওয়্যার সহায়তা, নেতৃত্ব ও নতুন পণ্যের ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশের একটি উদাহরণও দেখা যাক। তবে এটিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো পূর্বাভাস হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সিঙ্গার বাংলাদেশকে এ ক্যাটাগরি থেকে জেড ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেয়। কারণ কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে ২০৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা তার ৯৯ কোটি ৭০ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের চেয়েও বেশি। প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কোম্পানিটির মোট লোকসান ছিল প্রায় ২৭৪ কোটি টাকা। এর বড় কারণ ছিল ঋণের সুদসহ অর্থায়ন ব্যয় বেড়ে যাওয়া।
জেড ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার জন্য মার্জিন ঋণ পাওয়া যায় না। এসব শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তিতেও তিন কার্যদিবস লাগে, যেখানে সাধারণ শেয়ারের ক্ষেত্রে সময় লাগে দুই কার্যদিবস। ওই সময়ে জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির সংখ্যা ছিল ১২৭টি।
এই উদাহরণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বোঝা যায়। ঋণের সুদ বেড়ে লোকসান হলে সমাধানের পথ এক রকম, আর পণ্য বিক্রি কমে লোকসান হলে পথ আরেক রকম। তাই কোনো কোম্পানি ঘুরে দাঁড়াবে বলে বিনিয়োগ করার আগে বুঝতে হবে, লোকসানের মূল কারণ কী এবং সেটি দূর করার বাস্তবসম্মত উপায় আছে কি না। শুধু ভালো ভবিষ্যতের গল্প যথেষ্ট নয়। সেই পরিবর্তন ঘটার নির্দিষ্ট পথও থাকতে হবে।
যখন গল্পই শেয়ারের দাম ঠিক করে
লোকসানি শেয়ারের তৃতীয় কারণটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চেয়ে বিনিয়োগকারীদের আশা, ভয় ও বাজারের সামগ্রিক মেজাজ বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
অধ্যাপক ম্যালকম বেকার ও জেফ্রি ওয়ার্গলারের ২০০৬ সালের একটি গবেষণায় ১৯৬৩ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মাসিক বাজারতথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ছোট, নতুন, অস্থির ও লোকসানি কোম্পানি, লভ্যাংশ দেয় না এমন প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা থাকা শেয়ারগুলো বাজারের মেজাজের সঙ্গে বেশি ওঠানামা করে। বাজারের মনোভাব যখন নেতিবাচক থাকে, তখন পরবর্তী সময়ে এসব শেয়ারের রিটার্ন তুলনামূলক ভালো হতে পারে। আবার বাজার অতিরিক্ত আশাবাদী হলে পরবর্তী রিটার্ন তুলনামূলক কম হতে পারে। এসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মতভেদ বেশি থাকে। একই সঙ্গে শেয়ারের দাম কমবে ধরে বিনিয়োগ করাও অনেক সময় কঠিন হয়।
জন মেনার্ড কেইনস এ ধরনের আচরণ বোঝাতে সুন্দরী প্রতিযোগিতার উদাহরণ দিয়েছিলেন। সেখানে মানুষ নিজের পছন্দের মুখটি বেছে নেয় না শুধু, বরং অন্যরা কোন মুখকে সবচেয়ে সুন্দর মনে করবে, সেটিও অনুমান করার চেষ্টা করে। শেয়ারবাজারেও অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির প্রকৃত মূল্য কত, তার চেয়ে অন্য বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে শেয়ারটিকে কতটা মূল্য দেবেন, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেন।
অধ্যাপক জে রিটারের আইপিওসংক্রান্ত তথ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যায়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে লোকসানি কোম্পানির আইপিও ছিল প্রায় ১৯ শতাংশ। ডটকম বুদবুদের সময়ে এই হার ১৯৯৯ সালে বেড়ে ৭৬ শতাংশ এবং ২০০০ সালে ৮১ শতাংশে পৌঁছায়। ওই দুই বছরে লোকসানি কোম্পানিগুলোর শেয়ার প্রথম দিনেই গড়ে ৭১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছিল। তুলনায় লাভজনক কোম্পানির শেয়ারের গড় বৃদ্ধি ছিল ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৮০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের হিসাবে এই হার যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৭ ও ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় লোকসানি কোম্পানির শেয়ারেও বেশি দাম দিতে রাজি থাকেন। তবে বেশি দামে কেনা মানেই ভালো বিনিয়োগ নয়। ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের ১ হাজার ৬৪৫টি আইপিওর সামগ্রিক হিসাবে দেখা যায়, তালিকাভুক্তির পর তিন বছরে এসব শেয়ারের রিটার্ন গড়ে বাজারের চেয়ে প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম ছিল। এই হিসাব শুধু লোকসানি কোম্পানির নয়, তবে আইপিও ঘিরে অতিরিক্ত উত্তেজনার মূল্য যে বিনিয়োগকারীদের দিতে হতে পারে, সেটি বোঝায়।
অ্যামাজনের শেয়ারের ইতিহাসও একই সতর্কবার্তা দেয়। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছানোর পর ২০০১ সালের মধ্যে শেয়ারটির দাম প্রায় ৯৪ শতাংশ পড়ে যায়। আগের সর্বোচ্চ দামে ফিরতে কোম্পানিটির শেয়ারের সময় লাগে ২০০৯ সালের শেষ পর্যন্ত। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সফল হওয়া কোম্পানির শেয়ারেও দীর্ঘ সময় বড় ধরনের ক্ষতি সহ্য করতে হতে পারে।
মুনাফা হলেই কি কোম্পানি নিরাপদ?
কোম্পানি লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরেছে, এই তথ্য নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু মুনাফার অঙ্ক দেখলেই বোঝা যায় না, ব্যবসা সত্যিই শক্তিশালী হয়েছে কি না। মুনাফা কোথা থেকে এসেছে, সেটিও দেখতে হয়।
২০২০ সালে টেসলা ৭২ কোটি ১০ লাখ ডলার মুনাফা করে। আগের বছর কোম্পানিটির লোকসান ছিল ৮৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। কিন্তু সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্য গাড়ি নির্মাতাদের কাছে নিয়ন্ত্রক ক্রেডিট বিক্রি থেকে পাওয়া ১৫৮ কোটি ডলার বাদ দিলে ওই বছরও টেসলার লোকসান হতো। ওই বছরের ডিসেম্বরে টেসলা এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়। সূচকটিতে অন্তর্ভুক্তির একটি শর্ত হলো, সর্বশেষ চার ত্রৈমাসিক মিলিয়ে কোম্পানির মোট মুনাফা ইতিবাচক হতে হবে এবং সর্বশেষ ত্রৈমাসিকেও মুনাফা থাকতে হবে।
উবারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিষয় দেখা যায়। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি প্রায় ১৯০ কোটি ডলার মুনাফা করে। এর আগের বছর লোকসান ছিল ৯১০ কোটি ডলার। তবে ২০২৩ সালের মুনাফার প্রায় ১০০ কোটি ডলার এসেছিল ইক্যুইটি বিনিয়োগের মূল্য পুনর্নির্ধারণ থেকে, মূল ব্যবসা থেকে নয়।
এখানেই মূল বিষয়টি হলো, মুনাফার পরিমাণের পাশাপাশি তার উৎসও বুঝতে হবে। মূল ব্যবসা থেকে নিয়মিত মুনাফা আসতে থাকলে তা কোম্পানির শক্তিশালী হওয়ার পক্ষে ভালো প্রমাণ। বিপরীতে, এককালীন লাভ বা ব্যবসার বাইরের সুবিধা থেকে মুনাফা এলে কোম্পানির প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও তথ্যের প্রয়োজন হয়।
লোকসানি শেয়ার যাচাইয়ের তিনটি প্রশ্ন
লোকসানি শেয়ার বিবেচনা করার সময় আমি তিনটি প্রশ্নকে গুরুত্ব দিই। এগুলো মায়ার্সের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সুযোগসংক্রান্ত ধারণা ও দামোদারানের মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে নেওয়া একটি ব্যক্তিগত যাচাইয়ের ছক, কোনো প্রতিষ্ঠিত নিয়ম বা নিশ্চয়তা নয়।
প্রথম প্রশ্ন, কোম্পানিটি কেন লোকসান করছে? নতুন গ্রাহক আনা, উৎপাদন বাড়ানো বা ভবিষ্যতের বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় খরচের কারণে লোকসান হলে এবং সেই খরচ থেকে আয় ফেরত আসার বাস্তবসম্মত হিসাব থাকলে তা বিনিয়োগের অংশ হতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি না বাড়লেও একই ধরনের খরচ বছরের পর বছর চলতে থাকলে সেটি অপচয়ের লক্ষণ হতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, কোম্পানির হাতে কত দিন চলার মতো নগদ অর্থ আছে? নতুন কোম্পানির টিকে থাকার ঝুঁকি বাস্তব। নগদ অর্থ শেষ হয়ে গেলে কোম্পানিকে নতুন শেয়ার ছাড়তে হতে পারে। আর সেই শেয়ার কম দামে ছাড়তে হলে পুরোনো শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার অংশ কমে যেতে পারে। তাই শুধু ভবিষ্যতে আয় বাড়ার সম্ভাবনা নয়, সেই ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পৌঁছানোর মতো অর্থ কোম্পানির হাতে আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
তৃতীয় প্রশ্ন, বিক্রি বাড়লে লোকসান কি কমছে? বিক্রি দ্বিগুণ হওয়ার পরও যদি লোকসান আগের মতোই থাকে, তাহলে কোম্পানির প্রবৃদ্ধির গল্পের সঙ্গে আর্থিক ফলাফলের বড় ব্যবধান থাকতে পারে। পাশাপাশি শেয়ারের বর্তমান দামের কতটা নির্ভর করছে পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় পরের সম্ভাব্য আয়ের ওপর, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। ভবিষ্যতের আয়ের ওপর নির্ভরতা যত বেশি, অনুমান ভুল হওয়ার ঝুঁকিও তত বড়।
সব মিলিয়ে, লোকসান করছে বলেই কোনো কোম্পানির শেয়ার খারাপ, এমন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। আবার দ্রুত প্রবৃদ্ধির গল্প আছে বলেই শেয়ারটি ভালো বিনিয়োগ, এমনটিও নয়। বাজার অনেক সময় লোকসানের চেয়ে বেশি মূল্য দেয় সেই বিশ্বাসকে, যে কোম্পানিটি একদিন লোকসান কাটিয়ে উঠবে। বিনিয়োগকারীর কাজ হলো, সেই বিশ্বাসের পেছনে বাস্তব প্রমাণ আছে কি না, তা যাচাই করা। এটি একটি বিশ্লেষণ, বিনিয়োগের পরামর্শ নয়।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

