দীর্ঘ দুই বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৬১২ কোটি টাকা সংগ্রহের জন্য প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আবেদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজার থেকে ৫৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়। সাত বছর পর কোনো শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের আইপিওতে আসার উদ্যোগ এটি।
পুরুষ, নারী ও শিশুদের টি-শার্টসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে স্ক্যানডেক্স। সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ কারখানার সম্প্রসারণ এবং নতুন যন্ত্রপাতি কেনার কাজে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
এর আগে ২০১৯ সালে রিং শাইন টেক্সটাইল ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কয়েকটি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও রিং শাইনের পর আর কোনো শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক প্রতিষ্ঠান আইপিওতে আসেনি।
৫৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায় স্ক্যানডেক্স
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্ক্যানডেক্স (বিডি) লিমিটেডের কারখানা ঢাকার সাভারে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক হিসেবে কাজ করছে।
কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আইপিওর মাধ্যমে প্রতিটি শেয়ার ১৩ টাকা দরে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা এবং অতিরিক্ত মূল্য বা প্রিমিয়াম ৩ টাকা।
স্ক্যানডেক্সের পণ্য তালিকায় রয়েছে পুরুষ, নারী ও শিশুদের বিভিন্ন ধরনের টি-শার্ট। গোল গলা, ভি-গলা, লম্বা হাতার টি-শার্টের পাশাপাশি হুডি তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে কোম্পানিটির মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ পিস। কোম্পানির প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৫ লাখ পিস। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭০ লাখ পিসে।
আইপিও আবেদনে ছয় প্রতিষ্ঠানের ৬১২ কোটি টাকা
২০২৪ সালে শুরু হওয়া আইপিও স্থবিরতার পর নতুন করে পুঁজিবাজারে অর্থ সংগ্রহের আগ্রহ দেখাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক পরিস্থিতির চাপ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনীহা দীর্ঘদিন এই বাজারকে প্রভাবিত করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রকাশ্য শেয়ার বিক্রির বিধিমালা পর্যালোচনা ও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু শর্ত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা সহজ করার পর নতুন করে আইপিও আবেদনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ৬১২ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে এবং একটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করতে চায়।
প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ হলো—
- কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি: ৪০০ কোটি টাকা।
- স্ক্যানডেক্স (বিডি): ৫৫ কোটি টাকা।
- অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স: ৩৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
- পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং: ৭৮ কোটি টাকা।
- ডিজিকন টেকনোলজিস: ৩০ কোটি টাকা।
- প্রোটেকটিভ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স: ১৫ কোটি টাকা।
অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্সের পুঁজিবাজারে আসার উদ্যোগ
আইপিওর আবেদন করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স। ২০০৩ সালে অ্যালায়েন্স লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হলেও ২০১৭ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে।
স্থানীয় কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তার উদ্যোগে কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে সামিট গ্রুপ, র্যাংগস গ্রুপ, অ্যালায়েন্স হোল্ডিংস, গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এবং কনসেপ্ট নিটিংয়ের প্রতিনিধিরা যুক্ত ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, এর প্রধান শেয়ারধারী পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স পিএলসি। এটি শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রায়ত্ত পিপলস ব্যাংকের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা এবং শ্রীলঙ্কার আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে গ্রাহককেন্দ্রিক আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকা তুলতে চায় কনফিডেন্স পাওয়ার
ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ সংগ্রহের আবেদন করেছে কনফিডেন্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি দরপ্রস্তাব পদ্ধতিতে ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে চায়।
এ লক্ষ্যে আইপিও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ১০ দিনব্যাপী একটি বিনিয়োগকারী পরিচিতি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। ২০২৪ সালের শুরুতে টেকনো ড্রাগস দরপ্রস্তাব পদ্ধতিতে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় এই পদ্ধতিতে নতুন কোনো আইপিও আবেদন জমা পড়েনি।
নতুন নিয়ম অনুসারে, কনফিডেন্স পাওয়ার প্রতিটি শেয়ারের প্রাথমিক নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করেছে ২৪২ টাকা। দরপ্রস্তাবে অংশ নেওয়ার যোগ্য বিনিয়োগকারীরা এই দামের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি অথবা কম দরে প্রস্তাব দিতে পারবেন। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারিত হবে।
সংগৃহীত অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দুটি ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। এর একটি কক্সবাজারের উত্তরাঞ্চলে এবং অন্যটি বাগেরহাটের মোংলায় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইপিও থেকে পাওয়া অর্থের ৮৩ শতাংশ জমি কেনা ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। ১৫ শতাংশ ব্যবহার করা হবে ব্যাংকঋণ পরিশোধে এবং বাকি ২ শতাংশ ব্যয় হবে আইপিও-সংক্রান্ত কাজে।
পার্কওয়ে প্যাকেজিং তুলতে চায় ৭৮ কোটি টাকা
ডিবিএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পার্কওয়ে প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড পুঁজিবাজার থেকে ৭৮ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিটি শেয়ার ৪০ টাকা দরে ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্য এবং ৩০ টাকা অতিরিক্ত মূল্য।
নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে মোট ১ কোটি ৯৫ লাখ শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজারের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।
প্রসপেক্টাসের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংগৃহীত অর্থের মধ্যে ৬৫ কোটি টাকা কারখানার ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে। যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার জন্য রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাকি ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে আইপিও-সংক্রান্ত কাজে।
নির্ধারিত মূল্য পদ্ধতিতে অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে শেয়ার ছাড়ার এমন উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে বিরল। এর আগে ২০১৬ সালে ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস প্রতিটি শেয়ারে ১৯ টাকা অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত করে ৫৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল।
পুঁজিবাজারে নতুন গতি ফেরার অপেক্ষা
দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের আইপিও আবেদন দেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে পোশাক, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি, প্যাকেজিং ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাজারের জন্য খাতভিত্তিক বৈচিত্র্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে আবেদন জমা দেওয়া আর চূড়ান্তভাবে আইপিও অনুমোদন পাওয়া এক বিষয় নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাই, আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনার পরই এসব প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসার সুযোগ পাবে।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে আবেদনগুলোর পরবর্তী অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক তথ্যের ওপর।

