শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বেশ কিছু কোম্পানি এ বছর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এমন সামান্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যা বাস্তবে বিনিয়োগকারীর হাতে প্রায় কিছুই পৌঁছে দেয় না। সংখ্যার হিসাবে এ ধরনের কোম্পানি ৩৩টি। বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর চলা এ প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রকট হয়েছে, আর তার মূল উদ্দেশ্য শেয়ারের ক্যাটেগরি ধরে রাখা।
বস্ত্র খাতের কোম্পানি মুন্নুফ ফেব্রিক্সের উদাহরণ থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১১৫ কোটি টাকা। অথচ এ বছর তারা শূন্য দশমিক ১ শতাংশ, অর্থাৎ শেয়ারপ্রতি মাত্র এক পয়সা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এই নামমাত্র লভ্যাংশ পাবেন শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। উদ্যোক্তারা এবারও লভ্যাংশ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে কোম্পানিটি মোট লভ্যাংশ হিসেবে দেবে মাত্র সাত লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
শুধু একটি কোম্পানি নয়, চিত্রটি বেশ ব্যাপক। ৩০ জুন হিসাব বছর শেষ হওয়া ছয়টি কোম্পানি শেয়ারপ্রতি এক থেকে আড়াই পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আরও অন্তত ১৯টি কোম্পানি দেবে শেয়ারপ্রতি ১০ থেকে ৭৫ পয়সা। এর বাইরে অন্তত আটটি কোম্পানি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও তা কেবল সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রযোজ্য।
সব মিলিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য নামমাত্র লভ্যাংশসহ ঘোষণা দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা ৩৩। এসব কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন চার হাজার ৫৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে তারা বিতরণ করতে যাচ্ছে মাত্র ৮১ কোটি টাকা, যা মূলধনের ২ শতাংশ। আবার এই ৮১ কোটি টাকার মধ্যে ৯টি কোম্পানিই দেবে প্রায় পৌনে ৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাকি কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশের পরিমাণ আরও নগণ্য।
বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, কোম্পানিগুলো শেয়ারের ‘মার্কেট ক্যাটেগরি’ তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রাখতে চায়। এতে সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচার বাড়তি সুযোগ থাকে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কোম্পানি পরপর দুই বছর লভ্যাংশ না দিলে তাকে ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নামিয়ে দেওয়া হয়। এই ক্যাটেগরিতে গেলে লেনদেন নিষ্পত্তিতে লাগে তিন কর্মদিবস, যেখানে ‘এ’ বা ‘বি’ ক্যাটেগরিতে লাগে দুই কর্মদিবস। পাশাপাশি মার্জিন ঋণ সুবিধা বন্ধ হয়ে যায় এবং লেনদেনে বিধিনিষেধ আসে।
শুধু লেনদেনের সীমাবদ্ধতাই নয়, ‘জেড’ ক্যাটেগরিতে নামলে কোম্পানির মূলধন সংগ্রহ এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কেনাবেচার ওপরও নিয়ন্ত্রণমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়। এই প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি এড়াতে বিশাল মূলধনের কোম্পানিগুলোও কয়েক পয়সার লভ্যাংশ দিয়ে নিজেদের ‘এ’ বা ‘বি’ ক্যাটেগরিতে টিকিয়ে রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও স্টক এক্সচেঞ্জ এ ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে বলেই বছরের পর বছর এটি চলছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অন্তত ২৪টি কোম্পানি ৩০ জুন শেষ হওয়া হিসাব বছরের জন্য ২ শতাংশ বা তার কম লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম, শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি এক পয়সা লভ্যাংশ দিয়েছে ছয়টি কোম্পানি। সেগুলো হলো মুন্নুফ ফেব্রিক্স, সিলভা ফার্মা, ভিএফএস থ্রেড, কাট্টালি টেক্সটাইল, এমএল ডাইং ও ফার কেমিক্যাল। অ্যাডভেন্ট ফার্মা ঘোষণা করেছে দেড় পয়সা। আমরা নেটওয়ার্কস ও ড্রাগন সোয়েটার দিচ্ছে দুই পয়সা। বিবিএস কেবলস ও আমরা টেকনোলজিসের পর্ষদ সুপারিশ করেছে আড়াই পয়সা।
সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও জিবিবি পাওয়ারের লভ্যাংশের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। এক শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ১০টি কোম্পানি। এগুলো হলো আফতাব অটোমোবাইলস, জেনেক্স ইনফোসিস, ই-জেনারেশন, আরডি ফুড, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, দুলামিয়া কটন, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো, আল-হাজ টেক্সটাইল, নাভানা সিএনজি ও লিগ্যাসি ফুটওয়্যার। এ ছাড়া তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ দেড় শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এসব হার এতটাই কম যে বিও অ্যাকাউন্ট পরিচালনা ফি বা ব্যাংক চার্জের তুলনায়ও বিনিয়োগকারীর হাতে থাকা অর্থ নগণ্য।
শতাংশের হার যা-ই হোক, মোট বিতরণের অঙ্কেও চিত্রটি হতাশাজনক। অন্তত ২১টি কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য সব মিলিয়ে এক কোটি টাকার কম লভ্যাংশ বরাদ্দ করেছে। কারণ হিসেবে কোথাও পরিশোধিত মূলধন ছোট হওয়া, কোথাও অতিক্ষুদ্র লভ্যাংশের হারকে দায়ী করা হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে রহিম টেক্সটাইল ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিলেও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা পাবেন মাত্র ২৭ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। কেঅ্যান্ডকিউ ৫ শতাংশ ঘোষণা করলেও মোট অঙ্ক ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। বঙ্গজের ৩ শতাংশ নগদ লভ্যাংশের পরিমাণ ১৭ লাখ টাকা। হাক্কানি পাল্প ৩ শতাংশ হারে দেবে ৫৭ লাখ টাকা। দুই শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা বাংলাদেশ অটোকারস সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দেবে ছয় লাখ পাঁচ হাজার টাকা, আর দেশ গার্মেন্টস দেবে সাত লাখ ৪৬ হাজার টাকা।
এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, কোনো কোম্পানি কত শতাংশের নিচে লভ্যাংশ দিতে পারবে না, তা আইনে নির্দিষ্ট করা নেই। অর্থাৎ বর্তমান আইনি কাঠামোয় নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়াতে সরাসরি কোনো বাধা নেই।
এই ফাঁকের কারণেই প্রশ্ন উঠছে, লভ্যাংশের মূল উদ্দেশ্য কি বিনিয়োগকারীকে মুনাফার অংশ দেওয়া, নাকি কেবল ক্যাটেগরি বাঁচানোর আনুষ্ঠানিকতা পালন। লভ্যাংশের নিম্নসীমা নির্ধারণ কিংবা ক্যাটেগরি নির্ধারণের নিয়ম পর্যালোচনার মতো উদ্যোগ না এলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের লভ্যাংশকে আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করতে পারবেন না। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে লভ্যাংশ ঘোষণার আসল তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

