রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন নজরদারি ব্যবস্থা। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করতে এখন আর শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা নিজেই শনাক্ত করছে বিভিন্ন ধরনের নিয়মভঙ্গের ঘটনা।
লালবাতি অমান্য করা, উল্টো পথে যানবাহন চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো কিংবা গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার—এমন নানা অপরাধ এখন এআই প্রযুক্তির নজরে ধরা পড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বসানো এই ক্যামেরাগুলো বর্তমানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তবে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা শুধু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ভবিষ্যতে কি এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পলাতক আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খোঁজ করা অপরাধীদেরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে?
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, চলমান প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবেও এই প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পুলিশের তালিকাভুক্ত বিপুলসংখ্যক অপরাধী ও পলাতক আসামির তথ্য সংরক্ষণ করে একটি কেন্দ্রীয় এআই প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সিসিটিভি নেটওয়ার্কেও ধাপে ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর আরও প্রায় ৫০০ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল পয়েন্টে প্রায় ৮০টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করতে সক্ষম।
এর মধ্যে রয়েছে লালবাতি অমান্য করা, স্টপলাইন অতিক্রম করা, উল্টো পথে যানবাহন চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং অবৈধ পার্কিং। প্রযুক্তিটির বিশেষ দিক হলো, এটি শুধু ভিডিও ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নত সফটওয়্যারের মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি ও চালকের আচরণ বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও শনাক্ত করতে পারে। ফলে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনার এক-পঞ্চমাংশ বাস্তবায়ন, বাকি পথ এখনও দীর্ঘ:
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, রাজধানীতে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার মাত্র ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছি, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। সামনে এখনও অনেক কাজ বাকি। সময় লাগবে, তবে আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছি।” তিনি জানান, এআইভিত্তিক ক্যামেরাগুলো শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য নয়, অপরাধ তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে।
আনিছুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যামেরার আওতায় যা কিছু ঘটে, সবই সংরক্ষিত থাকে। কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণ করা সম্ভব হয়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে এই প্রযুক্তি মূলত ‘প্রতিক্রিয়াভিত্তিক পুলিশিং’ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ অপরাধ সংঘটনের পর তদন্তে সহায়তা করছে। তবে ভবিষ্যতে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রযুক্তির সহায়তায় সম্ভাব্য অপরাধীকে আগেভাগেই শনাক্ত করা যাবে। সেই লক্ষ্যেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে রাজধানীর স্মার্ট নজরদারি অবকাঠামো।
ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি: নজরদারির নতুন দিগন্ত
মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ বা ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি এমন একটি আধুনিক ব্যবস্থা, যা মানুষের মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার পরিচয় নির্ধারণ করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মুখের তথ্য আগে থেকেই ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। পরে কোনো ক্যামেরার সামনে সেই ব্যক্তি এলে সিস্টেম তার মুখের সঙ্গে সংরক্ষিত তথ্য মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে এই ব্যবস্থাকে ‘রিয়েল-টাইম ফেসিয়াল রিকগনিশন’ হিসেবে পরিচিতি দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক দেশেই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে সম্ভাব্য সন্দেহভাজন বা অপরাধী শনাক্তের জন্য।
বাংলাদেশে চলমান এআইভিত্তিক ক্যামেরা প্রকল্পে এখনো ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি যুক্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “বর্তমানে চালু থাকা এআই ক্যামেরা প্রকল্পে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি নেই। এটি মূলত ডিএমপির ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ।” তিনি আরও জানান, প্রযুক্তিগতভাবে অপরাধী শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমান প্রকল্পটি সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
খন্দকার রফিকুল ইসলামের ভাষায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা অপরাধীর ছবি ও তথ্য যদি সিস্টেমে যুক্ত করা যায়, তবে তিনি কোনো এলাকায় প্রবেশ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাওয়া সম্ভব। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশ এখনও সেই পর্যায়ের বাস্তবায়নে পৌঁছায়নি।
বিশ্বে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহার দেখা যায় চীনে। দেশটির বিভিন্ন শহরে গণপরিবহন, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন এবং সড়কে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। তবে এসব দেশে এই প্রযুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির সীমা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তির সুবিধা ও ঝুঁকি—দুই দিকই সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে।
বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফেস রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কেবল ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি বিস্তৃত ও নির্ভুল ডাটাবেজ, যেখানে লাখ লাখ মানুষের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী আইনি কাঠামো, তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার ও ডাটা সেন্টার এবং নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক অবকাঠামো থাকা জরুরি। এই সব উপাদান একসঙ্গে না থাকলে প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ট্রাফিক ক্যামেরা থেকে স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা:
পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান এআই ক্যামেরা প্রকল্পটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক বা পাইলট উদ্যোগ। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্যে রয়েছে যানবাহনের নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, সন্দেহভাজন যানবাহন ট্র্যাকিং, অপরাধ বিশ্লেষণ এবং সমন্বিত নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বর্তমানে এই ক্যামেরাগুলো মূলত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করছে। তবে ভবিষ্যতের স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থায় একই প্রযুক্তি আরও বিস্তৃত ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে পলাতক আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত, আইনি এবং নৈতিক প্রস্তুতি কত দ্রুত নিতে পারে—সেটিই নির্ধারণ করবে রাজধানীর ক্যামেরা ব্যবস্থা কেবল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি একদিন স্মার্ট নগর নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।” তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত জবাবদিহি ও আইনি সুরক্ষা ছাড়া এই প্রযুক্তির ব্যবহার নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

