গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির গোপন নথি চুরি করে চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর অভিযোগে সাবেক প্রকৌশলী লিনওয়েই ডিংকে ১২ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সান ফ্রান্সিসকোর ফেডারেল আদালত এই রায় দেয়। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে গুগলকে ১ লাখ ৮৯ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ এবং ২ হাজার ৫০০ ডলার জরিমানা দিতে হবে। আর কারাদণ্ড শেষে দুই বছর নজরদারিতে থাকতে হবে তাকে।
২০২২ সালের মে থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি গুগলের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম থেকে ২ হাজার পেজের বেশি গোপন তথ্য চুরি করেন, যার মধ্যে ছিল এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের নকশা। বিশেষ করে গুগলের নিজস্ব এআই চিপ টেনসর প্রসেসিং ইউনিট (টিপিইউ) এবং গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিটের (জিপিইউ) প্রযুক্তিগত বিবরণ। এ ছাড়া হাজার হাজার চিপকে একসঙ্গে যুক্ত করে সুপারকম্পিউটারের মতো কাজ করানোর সফটওয়্যার এবং গুগলের ‘স্মার্টনিক’ প্রযুক্তির তথ্যও ছিল তার চুরি করা নথির মধ্যে।
এই প্রযুক্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলো গুগলকে এনভিডিয়ার মতো বাইরের চিপ নির্মাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করে। নিজস্ব টিপিইউ ব্যবহার করে বড় এআই মডেল প্রশিক্ষণে গুগল প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকে। ডিং যদি এসব তথ্য অন্য কোম্পানির হাতে পৌঁছে দিতেন, তাহলে তারা বছরের পর বছর ধরে করা গবেষণার একটা বড় অংশ এড়িয়ে যেতে পারত। আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, ডিং এই তথ্যগুলো দুটি চীনা স্টার্টআপ কোম্পানির কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন, যেগুলোর সঙ্গে তিনি গোপনে কাজ করছিলেন।
মজার ব্যাপার হলো, ডিং কিন্তু প্রথমে আরও বড় শাস্তির মুখোমুখি ছিলেন। গত জানুয়ারিতে ১১ দিনের বিচার শেষে জুরি তাকে ৭টি অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি এবং ৭টি বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির প্রতিটি অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৫ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ ডলার জরিমানা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত ২০ আগস্ট বিচারক ভিন্স চাবরিয়া রায় দেন, ডিং চীনা সরকারকে সহায়তা করার অভিপ্রায়ে কাজ করেছেন, সেটি প্রমাণের পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই অর্থনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির ৭টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। বাণিজ্যিক গোপন তথ্য চুরির ৭টি অভিযোগ বহাল থাকে।
চীনা নাগরিক ‘লিওন ডিং’ নামেও পরিচিত এই প্রকৌশলী ২০১৯ সালে গুগলে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। ২০২১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পান। অভিযোগ, গুগলে কাজ করার সময় এআই সুপারকম্পিউটিং ডেটা সেন্টারের গোপন ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি তথ্য চুরি করেন। এরপর তিনি চীনে একটি কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি চুরি করা তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন।
প্রসিকিউটররা ডিংকে ৭০ মাস (প্রায় ৬ বছর) কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ডিংয়ের আইনজীবীরা মাত্র ৩ মাসের গৃহবন্দিত্বের আবেদন করেছিলেন। আদালত শেষ পর্যন্ত ১২ মাসের কারাদণ্ডই যথাযথ মনে করেছে। ডিংয়ের আইনজীবীরা বলেছেন, এই মামলায় ডিং তার চাকরি, বিবাহ এবং মানসিক স্বাস্থ্য—সবকিছু হারিয়েছেন। আর কারাদণ্ড শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্ভবত তাকে বহিষ্কারও করা হবে, যদিও তার ৮ বছরের ছেলে মার্কিন নাগরিক।
এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার এই মামলা প্রযুক্তি জগতে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে। গুগলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টের গোপন তথ্য চুরি করে প্রতিপক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা, আদালতের এই রায় আগামী দিনে এমন অপরাধের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

