দেশীয় উদ্ভাবনকে গবেষণাগার বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিন দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল সোয়া ১১টায় রাজধানীর বিজয় সরণিতে অবস্থিত নভোথিয়েটারে এই মেলার উদ্বোধন করেন তিনি। ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই মেলার আয়োজক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। উদ্ভাবকদের সঙ্গে নীতিনির্ধারক, শিল্প উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে টেকসই অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই মেলার মূল লক্ষ্য।
মেলায় সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, উদীয়মান স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিচ্ছেন। প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতে এক হাজারেরও বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। মেলায় ১৭টি সেশন থাকছে, যার মধ্যে রয়েছে ছয়টি প্লেনারি, ছয়টি সমান্তরাল সেশন এবং পাঁচটি রাউন্ডটেবিল। মেলার দ্বিতীয় দিনে ‘হেলথকেয়ার ইনোভেশন ফর অল: এক্সপ্যান্ডিং অ্যাক্সেস টু অ্যাফোর্ডেবল অ্যান্ড ইনক্লুসিভ হেলথকেয়ার’ শীর্ষক একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক সেশন অনুষ্ঠিত হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে এই সেশনে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এই সেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
আয়োজকরা বলছেন, দেশে তৃণমূল পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি ও ধারণা তৈরি হয়, কিন্তু নীতিসহায়তা, প্রাথমিক অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার অভাবে সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায় না। এই প্রশাসনিক ও আর্থিক বাধা দূর করা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের পথ তৈরি করাই মেলার মূল উদ্দেশ্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম মেলার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘জ্ঞানকে সমাধানে, গবেষণাকে পণ্যে, ধারণাকে উদ্যোগে এবং উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যে রূপান্তর করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘উদ্ভাবন কখনো বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হতে পারে না। এর জন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প, অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) মেলার নীতি সহযোগী হিসেবে রয়েছে। এনবিআর ও ডিপিডিটি মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা করছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে এবং ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) কৌশলগত সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এই মেলা শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, এটি বাংলাদেশের উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার একটি বড় পদক্ষেপ। দেশে অনেক তরুণ উদ্ভাবক ও স্টার্টআপ রয়েছেন, যাদের ধারণা বিশ্বমানের। কিন্তু সেই ধারণাকে পণ্যে রূপান্তর করে বাজারে পৌঁছে দেওয়ার পথ এখনো কঠিন। মেলাটি সেই সেতু তৈরির চেষ্টা করছে। তবে সফলতা নির্ভর করছে মেলার পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর, যেসব উদ্ভাবন প্রদর্শিত হচ্ছে, সেগুলোর জন্য অর্থায়ন, পেটেন্ট সহায়তা ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যায়। মেলার আয়োজকরা বলছেন, এখান থেকে তৈরি হওয়া সংযোগ ও অংশীদারত্ব ভবিষ্যতে দেশীয় উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপান্তরিত করতে সহায়ক হবে। তরুণ উদ্ভাবকদের জন্য এই মেলা একটি বড় সুযোগ, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাবে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

