বাবা টেম্পো চালান, ছেলের হাতে আইফোন। মায়ের পরনে ছেঁড়া কাপড়, ছেলের বাহন পালসার।
এই ছবি শুধু একটি পরিবারের নয়। চারপাশে তাকালে এমন দৃশ্য আমরা প্রায়ই দেখি। অভাবের সংসারে সন্তানের শখ মেটাতে বাবা-মা নিজেদের প্রয়োজন বিসর্জন দেন। সন্তানের প্রতি স্নেহ থেকে এটা বোঝা যায়। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়: আমরা সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছি সম্ভাবনা, নাকি কেবল ভোগের প্রতীক? এখানে দোষ কোনো একজন বাবা-মা বা একটি ছেলের নয়। দোষ একটি সমাজের, যার সাফল্যের মাপকাঠিই বদলে গেছে।
যখন শিক্ষিত মানুষ ছিলেন গ্রামের গর্ব
কুড়ি বছর আগেও গ্রামে দুজন শিক্ষিত মানুষ থাকলে পুরো গ্রামের গৌরব বেড়ে যেত। তিনজন শিক্ষিত মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বললে দূর থেকেও একধরনের সমীহ তৈরি হতো। স্কুলশিক্ষক, পোস্টমাস্টার বা কলেজপড়ুয়া তরুণের কথার ওজন ছিল। মানুষ তাঁদের কাছে যেত পরামর্শ নিতে, চিঠি লেখাতে, বিবাদ মেটাতে। জ্ঞান, শিক্ষা, বই ও সংস্কৃতি ছিল সামাজিক মর্যাদার অংশ।
এখন সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল। কেন?
তথ্যের স্রোতে হারানো জ্ঞান
কারণ আমরা জ্ঞান অর্জনের জায়গাটি ছেড়ে দিয়েছি তথ্যের স্রোতের হাতে। একটি প্রজন্ম ফেসবুক থেকে ইতিহাস শিখছে, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে প্রচারণা গিলছে, টিকটক ও শর্ট ভিডিওর অ্যালগরিদম থেকে ধার করছে বিনোদন, রুচি ও জীবনবোধ।
এই অ্যালগরিদম আমাদের কী দেখাবে, তা ঠিক করে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার হিসাব, সত্য বা কল্যাণের হিসাব নয়। যা বেশি উত্তেজনা জাগায়, তা-ই বেশি ছড়ায়। ফলে গভীর ভাবনার চেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বেশি পুরস্কৃত হয়। বই পড়ার বদলে স্ক্রল করা, যুক্তি যাচাইয়ের বদলে শেয়ার করা, শিল্প বোঝার বদলে ভাইরাল কনটেন্টের পিছু নেওয়া, এভাবেই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চিন্তার কাঠামো। যে মন তিরিশ সেকেন্ডের ভিডিওতে অভ্যস্ত, তার কাছে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ বা উপন্যাস ক্রমেই বোঝা মনে হয়।
ফল শুধু রুচির অবক্ষয় নয়। বদলে যাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাও। এক সময় তরুণেরা স্বপ্ন দেখত চিকিৎসক, শিক্ষক, লেখক বা বিজ্ঞানী হওয়ার। এখন অনেকের স্বপ্ন কেবল ‘ভাইরাল’ হওয়া, রাতারাতি জনপ্রিয় হওয়া।
শিক্ষা যখন কেবল সনদ
সংকটটা শুধু পর্দার ভেতরে নয়, শ্রেণিকক্ষেও। শিক্ষা এখন বহু জায়গায় জ্ঞানের সাধনা নয়, চাকরির টিকিট। মুখস্থবিদ্যা, নোট-গাইড, কোচিং আর পরীক্ষার নম্বরের দৌড়ে শেখার আনন্দ হারিয়ে গেছে। শিক্ষার্থী জানতে চায় ‘কী আসবে পরীক্ষায়’, ‘কেন’ নয়। যে শিক্ষা প্রশ্ন করতে শেখায় না, সে শিক্ষা একটি সমাজকে সচেতন করে না; সনদধারী করে মাত্র।
সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সমাজের দায়
হয়তো এমন দিন আসবে, যখন সন্তান স্কুলে যেতে চাইলে বাবা-মা আনন্দের বদলে আতঙ্কিত হবেন। পড়াশোনার খরচ, নিরাপত্তা, সামাজিক পরিবেশ, সব মিলিয়ে তাঁরা ভাববেন, সন্তানকে এই অস্থির বাস্তবতায় কীভাবে টিকিয়ে রাখবেন। অথচ সমাজের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।
ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, একটি সন্তান নেবেন। তাকে স্বাস্থ্যকর খাবার দেবেন, ভালো শিক্ষা দেবেন, মানুষ করবেন। কিন্তু যে সমাজে সে বড় হবে, সেটি যদি প্রতিদিন তাকে উল্টোদিকে টানতে থাকে, তবে একটি পরিবারের সচেতনতা দিয়ে কতটা ঠেকানো সম্ভব? একটি ঘর আলোকিত রেখে লাভ কী, যদি গোটা পাড়া অন্ধকারে ডুবে যায়?
নগর পুড়লে দেবালয় বাঁচে না।
মাৎস্যন্যায়ের নতুন রূপ
আমাদের ইতিহাসে ‘মাৎস্যন্যায়’ ছিল সেই অরাজকতার প্রতীক, যেখানে বড় মাছ ছোট মাছকে গ্রাস করে, অর্থাৎ শক্তিমান দুর্বলকে। আজ সেই গ্রাসের রূপ বদলেছে। কখনো তা মাদক, কখনো জুয়া ও অনলাইন বেটিং, কখনো ডিজিটাল আসক্তি, কখনো সহিংসতা, আবার কখনো অর্থহীন ভোগবাদ। এই গ্রাসের শিকার সবচেয়ে বেশি তরুণেরা, যাদের হাতে সময় আছে, কিন্তু দিকনির্দেশনা নেই।
যে সমাজে সন্তানের হাতে বইয়ের বদলে দামি ফোন তুলে দেওয়াই সাফল্যের প্রতীক, সেখানে প্রশ্ন উঠবেই: আমরা আসলে সন্তানদের কী দিচ্ছি?
পাতের খাবারে সমাজের ছবি
খাদ্যাভ্যাসেও বাস্তবতার ছবি বদলেছে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ একসময় ছিল সমৃদ্ধির পরিচয়। এখন বহু পরিবারে মাছ নিয়মিত পাতের খাবার নয়, হিসাব কষে কেনা পণ্য। একসময় যে পোল্ট্রি মুরগিকে অবজ্ঞা করা হতো, তার সস্তা অংশই এখন অনেকের প্রোটিনের প্রধান ভরসা।
এটি শুধু রুচির পরিবর্তন নয়। এটি ক্রয়ক্ষমতা, জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। যে সমাজে একদিকে দামি ফোন আর মোটরবাইকের প্রদর্শনী, অন্যদিকে পাতে পুষ্টিকর খাবারের অভাব, সেখানে অগ্রাধিকারের হিসাবটাই গোলমেলে।
নিরাপত্তাহীনতা: ভেঙে পড়া বিশ্বাসের কাঠামো
আরও ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতা। যে সমাজে শিক্ষককে জ্ঞান ও নৈতিকতার প্রতীক ভাবা হতো, সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। তখন শুধু একজন অপরাধীর বিচার করলেই প্রশ্ন ফুরোয় না। জানতে হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি না, ভুক্তভোগী সাহস করে মুখ খুললে সমাজ তার পাশে দাঁড়ায় কি না, নাকি উল্টো তাকেই চুপ করিয়ে দেয়।
সামান্য স্বর্ণালঙ্কারের জন্য একজন গৃহশিক্ষিকাকে হত্যা, একটি মোবাইল ফোনের জন্য একটি শিশুর প্রাণ যাওয়া, এসব ঘটনা আলাদা আলাদা করে দেখলে পরিসংখ্যান হয়, কিন্তু সংকটটা বোঝা যায় না। অপরাধ শুধু আইন ভাঙার ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে মূল্যবোধের পতন, বৈষম্য, দারিদ্র্য, লোভ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। যেখানে মানুষের জীবনের দাম একটি ফোন বা কয়েক ভরি সোনার চেয়ে কম হয়ে যায়, সেখানে সমাজের ভিত্তিটাই নড়বড়ে।
আমরা কি অতীত ভুলে গেছি?
বাংলার অতীতের দিকে তাকালে প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়। বহু শতাব্দী আগে, যখন বিশ্বের নানা অঞ্চলে জ্ঞানচর্চা সীমিত গণ্ডিতে আটকে ছিল, তখন বঙ্গ ও গৌড়ের জনপদে শিক্ষা, দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লালমাই, বরেন্দ্রভূমি ও সোমপুরসহ প্রাচীন বাংলার নানা শিক্ষাকেন্দ্র ও বিহার সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে এই অঞ্চলের সূক্ষ্ম বস্ত্র, কারুশিল্প ও নৌ-বাণিজ্যের কথাও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ এই ভূখণ্ডের ইতিহাস শুধু দারিদ্র্যের নয়। এটি একসময় জ্ঞান, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। এমনকি মাৎস্যন্যায়ের অরাজকতা কাটিয়ে উঠে নতুন শৃঙ্খলা গড়ার ইতিহাসও আমাদেরই। তার মানে, সংকট কাটানোর সক্ষমতা এই সমাজের আগেও ছিল।
তাহলে প্রশ্ন, একটি সমাজ কীভাবে নিজের আত্মবিশ্বাস হারায়? কীভাবে শিক্ষা সামাজিক মর্যাদার কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে কেবল চাকরির সনদ হয়ে দাঁড়ায়? কীভাবে বই পড়া কমে গিয়ে স্ক্রলিংই প্রধান বিনোদন হয়ে ওঠে? কীভাবে সংস্কৃতি ভোগ্যপণ্যে পরিণত হয়? কীভাবে সন্তানকে মানুষ করার চেয়ে তাকে ‘সফল’ দেখানো বড় হয়ে ওঠে? আর সবচেয়ে বড় কথা, কীভাবে আমরা এসব পরিবর্তনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই?
একটি সমাজ হঠাৎ ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে তার ভাষা বদলে যায়, রুচি বদলে যায়, শিক্ষার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতার সংজ্ঞা বদলে যায়। একসময় মানুষ প্রশ্ন করাও বন্ধ করে দেয়।
বিপদটা সেখানেই।
প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারই নির্ধারক
প্রযুক্তিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের হাতে আজ স্মার্টফোন আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে, দ্রুত যোগাযোগ ও জ্ঞান অর্জনের অসীম সুযোগ আছে। একই ফোনে একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেখতে পারে, আবার সারা রাত অর্থহীন ভিডিওতেও ডুবে থাকতে পারে। প্রযুক্তি মানুষকে জ্ঞানী করে না; ফল নির্ভর করে মানুষ তাকে কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর।
সন্তানকে স্মার্টফোন দিয়ে যদি চিন্তার ক্ষমতা না দিই, তথ্য দিয়ে যদি যাচাই শেখাতে না পারি, স্বাধীনতা দিয়ে যদি দায়িত্ববোধ না শেখাই, তবে প্রযুক্তি জ্ঞানের হাতিয়ার না হয়ে বিভ্রান্তির যন্ত্র হয়ে উঠবে।
তাহলে করণীয় কী
শুধু হা-হুতাশ করলে তো আর সমাধান আসে না। কয়েকটি জায়গায় নজর দেওয়া জরুরি।
পরিবারে সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার আগে তার ব্যবহারের সময় ও সীমা ঠিক করা, নিজেরাও বই পড়ে দৃষ্টান্ত হওয়া, সন্তানের সঙ্গে গল্প করা ও প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাপদ্ধতির বদলে বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল সচেতনতা শেখানো, এবং যৌন হয়রানিসহ যেকোনো অভিযোগের জন্য নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
সমাজে গ্রন্থাগার, পাঠচক্র, খেলার মাঠ ও সাংস্কৃতিক আয়োজন আবার প্রাণবন্ত করা, যাতে তরুণদের সময় কাটানোর অর্থবহ বিকল্প থাকে। শিক্ষক, লেখক ও গবেষকদের সামাজিক সম্মান ফিরিয়ে আনা।
রাষ্ট্রে মাদক, জুয়া ও অনলাইন অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো, এবং অপরাধের বিচারে দ্রুততা ও নিরপেক্ষতা।
মানুষ গড়ার প্রশ্ন
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনসংখ্যা নয়, তার মানুষ। আর মানুষ তৈরি হয় শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার মধ্য দিয়ে। কেবল সংখ্যা বাড়ালে, মানুষ হওয়ার শিক্ষা না দিলে, সেই সংখ্যা শক্তি হয় না; সংকটকেই বড় করে।
তাই প্রশ্নটি সরল: আমরা কি শুধু সন্তান বড় করছি, নাকি মানুষ তৈরি করছি?
অতীতের গৌরব নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার সময় নেই। ইতিহাসের সমৃদ্ধি কোনো জাতিকে বর্তমানের অবক্ষয় থেকে বাঁচায় না, আর সেই গর্ব দিয়ে আজকের ব্যর্থতাও ঢাকা যায় না। ইতিহাসের গৌরব আমাদের সান্ত্বনা নয়, দায় হওয়া উচিত। এখন দরকার থামা, নিজেদের দিকে তাকানো, প্রশ্ন করা।
কারণ সমাজ যখন ভুল পথে হাঁটে, তখন সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কেউ আর থামতে বলে না।
কেউ তো অন্তত বলুক, বন্ধ হোক এই অনাচার।

