বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের ব্যবহার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছালেও স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারে এখনো বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবার এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগের বাইরে রয়েছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে এসব পরিবারের সদস্যরা স্মার্টফোনভিত্তিক সুবিধা থেকে পিছিয়ে আছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহার জরিপ ২০২৫-২৬’-এর চতুর্থ প্রান্তিকের প্রতিবেদনে দেশের প্রযুক্তি ব্যবহারের বর্তমান চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের কাছে বর্তমানে স্মার্টফোন রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার এখনো স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারছে না।
তবে এক বছরের ব্যবধানে স্মার্টফোন থাকা পরিবারের সংখ্যা সামান্য বেড়েছে। এক বছর আগে দেশের ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের কাছে স্মার্টফোন ছিল। অর্থাৎ এই সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী পরিবারের হার বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ।
স্মার্টফোনের বিস্তারের পাশাপাশি সাধারণ মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেশে প্রায় সর্বজনীন অবস্থায় পৌঁছেছে। জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯৯ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে। অর্থাৎ মোবাইল যোগাযোগের সুবিধা প্রায় সব পরিবারের কাছেই পৌঁছেছে। তবে স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এখনো আর্থিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত ব্যবহারের পার্থক্যের কারণে একটি বড় অংশ পিছিয়ে রয়েছে।
স্মার্টফোন থাকলেও সব পরিবারের কাছে ইন্টারনেট সুবিধা নেই। জরিপ অনুযায়ী, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী পরিবারের মধ্যে মাত্র ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ফলে শুধু যন্ত্রের মালিকানা নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই জরিপটি ‘ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে জেলাভিত্তিক আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের মানুষের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ, অভ্যাস এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সূচকের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রথমবার ২০১৩ সালে মডিউলার সার্ভের অংশ হিসেবে আইসিটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এরপর ২০২২ ও ২০২৩ সালে পৃথক জরিপের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের বিভিন্ন সূচক প্রকাশ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নকে ১৯টি সূচকের তথ্য দেওয়া হয়।
বর্তমান জরিপে আধুনিক তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। কম্পিউটার সহায়তাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বছরে চারটি প্রান্তিকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তিনটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নকে ২২টি সূচকের তথ্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই জরিপে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী ও পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার ২ হাজার ৫৬৮টি নির্বাচিত নমুনা এলাকায় প্রতি প্রান্তিকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতি প্রান্তিকে ২৪টি করে মোট ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়েছে। পুরো বছরে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রম পরিচালনায় ৬৪ জেলায় ২১৪ জন প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মোবাইল ফোন নয়, দেশের অন্যান্য প্রযুক্তি সুবিধার ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। বর্তমানে দেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে। এছাড়া ৬০ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের টেলিভিশন, ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারের রেডিও এবং ৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটার রয়েছে।
ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হারেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার বেড়ে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছায়।
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বর্তমানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এক বছর আগে এই হার ছিল ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ছিল ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়।
নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। এক বছর আগে যেখানে ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের নিজস্ব মোবাইল ফোন ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই হার ছিল ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
তবে কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতি এখনো ধীর। জরিপে দেখা গেছে, পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে মাত্র ১১ দশমিক ৮ শতাংশ কম্পিউটার ব্যবহার করেন। গত বছর এই হার ছিল ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুধু মোবাইল ফোনের বিস্তার নয়, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান সময়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানের অনেক ক্ষেত্রেই ডিজিটাল সুবিধার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সুযোগ বৃদ্ধি হলে দেশের সাধারণ মানুষ আরও সহজে বিভিন্ন তথ্য ও সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতা বাড়লে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, এই জরিপের তথ্য টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, জেলা পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হবে।
দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে ডিজিটাল সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। মোবাইল ফোনের বিস্তারের পরবর্তী ধাপে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বৈষম্য কমানোই হবে বাংলাদেশের ডিজিটাল উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

