কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে তীব্র বিতর্ক চলছে, তাতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন চিপ প্রস্তুতকারক জায়ান্ট এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটার সম্ভাবনা ‘শূন্য শতাংশ’। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হুয়াং বলেন, ‘২০৩০ সালে পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে না। এ দাবির পেছনে কোনো তথ্যভিত্তি নেই, কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই।’ তিনি প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের এমন সতর্কবার্তাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই মন্তব্যের পটভূমি হলো, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অ্যানথ্রপিকের মতো শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা একের পর এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে এই প্রযুক্তি আগামী দশকের মধ্যে মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন প্রতিষ্ঠানটি থেকে পদত্যাগ করে বলেছেন, যে দলগুলো এআই তৈরি করছে, তারা ‘আগামী দশকের মধ্যে আমাদের সবাইকে হত্যা করতে পারে’ বলে বিশ্বাস করেন। তার এই মন্তব্যের সমর্থনে অ্যানথ্রপিকের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইভান হুবিঙ্গার বলেছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআই মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটানোর সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি।
হুয়াংয়ের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল ওই গবেষকদের সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, এ ধরনের ‘ডুমসডে ন্যারেটিভ’ বা ধ্বংসাত্মক আখ্যান ছড়ানো ঠিক নয়, কারণ এতে মানুষের মধ্যে অহেতুক ভয় তৈরি হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই কোম্পানি ‘ধীর গতিতে এগোনোর’ আহ্বান জানিয়ে আসলে নিজেদের জন্য আইনি সুরক্ষা চাইছে। হুয়াংয়ের ভাষায়, ‘তারা আসলে নতুন আইন চাইছে না, তারা চাইছে যেসব আইন আছে, সেগুলো থেকে অব্যাহতি। এটাই সমস্যা।’ তার মতে, সাইবার নিরাপত্তা, পণ্যের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কিত যেসব আইন ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, সেগুলো প্রয়োগ করাই যথেষ্ট। এনভিডিয়ার প্রধান আরও মনে করেন, এআই শিল্পের দায়িত্বশীল বিকাশ নিশ্চিত করা তার কোম্পানির নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত, কারণ নিরাপত্তা ব্যাহত হলে কোম্পানির মূল্যও কমে যাবে।
এই যুক্তির বিপরীতে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমাদের অবশ্যই এআই মডেলের ক্ষমতা বৃদ্ধির গতি ধীর করতে হবে।’ তার এই আহ্বানে সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যান এবং টেসলা ও এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ে উদ্বেগকে ‘হোয়াক্স’ বা প্রতারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এদিকে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের উপগভর্নর সারাহ ব্রিডেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টদের কারণে আর্থিক বাজারে বড় ধরনের ধস নামার ঝুঁকি মোকাবেলায় আর বেশি সময় নেই। তিনি জানিয়েছেন, এই ধরনের এজেন্টরা যদি একই সংকেতে একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তাহলে বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। এই ঝুঁকি ঠেকাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ‘কিল সুইচ’ বা জরুরি বন্ধকরণ পদ্ধতি ব্যবহারের সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখছে। ব্রিডেনের মতে, এই প্রযুক্তি সাধারণ হয়ে ওঠার আগেই নিয়ন্ত্রকদের প্রস্তুত থাকতে হবে, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে এমন ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের পেছনে যে বিপুল অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৫টি তথ্যকেন্দ্র (ডেটা সেন্টার) নির্মাণ প্রকল্প প্রতিবাদকারীদের কারণে বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা ওই সময়ে ট্র্যাক করা সমস্ত নতুন বড় প্রকল্পের অর্ধেকেরও বেশি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগের মূল কারণগুলো হলো, ডেটা সেন্টারগুলোর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার এবং পরিবেশের ওপর প্রভাব। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯টি অঙ্গরাজ্যে এই ধরনের ৮৪৩টি বিরোধী সংগঠন সক্রিয় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জেনসেন হুয়াংয়ের ‘শূন্য সম্ভাবনা’ মন্তব্য এবং শীর্ষ এআই গবেষকদের ‘১০ শতাংশের বেশি ঝুঁকি’ সতর্কবার্তার মধ্যে দিয়ে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিমুখী অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে প্রযুক্তি জায়ান্টরা সম্ভাবনার ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা গবেষকরা ঝুঁকি এবং আর্থিক বাজার ও সমাজে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্কের মধ্যেই এআই উন্নয়নের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হয়।

