বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাত দ্রুত বড় হচ্ছে, আর এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাতটিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। দীর্ঘদিন ধরে টেলিযোগাযোগ খাতে সক্রিয় থাকা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সফটওয়্যার, সার্ভার, ডেটা সেন্টার, ব্যক্তিগত ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোর মতো নতুন ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি চীনা কোম্পানিগুলোর উপস্থিতিও ক্রমেই বাড়তে শুরু করেছে।
দেশে ব্যবসা, ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, শিল্প উৎপাদন ও সরকারি কার্যক্রমের প্রায় সব স্তরেই এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। এর হাত ধরে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বড় আকারের তথ্য বিশ্লেষণের চাহিদাও লাফিয়ে বাড়ছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে একটি লোভনীয় বাজারে রূপান্তরিত করছে।
একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারের আকার ছিল প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের সমান। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে এই বাজার বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারে, এবং ২০২৬ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাজারটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে প্রায় সাড়ে বারো শতাংশের কাছাকাছি।
এই বাজারের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, টেলিযোগাযোগ এবং ক্লাউড—এই চার খাত মিলেই মূল কাঠামো তৈরি করেছে। এর মধ্যে টেলিযোগাযোগের অংশ সবচেয়ে বেশি, প্রায় অর্ধেক। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা খাতের অবদান প্রায় ৩৮ শতাংশের কাছাকাছি, আর ব্যাংক, আর্থিক সেবা ও বীমা খাত মিলিয়ে প্রায় ২২ শতাংশ চাহিদা তৈরি করছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, সাইবার সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কারণে এই খাতে প্রযুক্তি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে টেলিযোগাযোগ আকারে সবচেয়ে বড় হলেও, প্রবৃদ্ধির গতিতে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা খাত অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।
দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি বিভিন্ন প্রযুক্তি সমাধান। মূল ব্যাংকিং সফটওয়্যার হিসেবে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠানের পণ্য ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি দেশীয় সফটওয়্যারও কাজে লাগানো হয়। তবে ব্যাংকের প্রযুক্তি কাঠামো শুধু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারেই সীমাবদ্ধ নয়—এর সঙ্গে জড়িত আছে তথ্যভাণ্ডার, সার্ভার, প্রসেসর, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেবা সচল রাখার বিকল্প অবকাঠামো। এসব ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য রয়েছে। এ কারণে একটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবস্থা সাধারণত কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না—একেক অংশ আসে একেক উৎস থেকে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই চীনা কোম্পানিগুলো নতুন উদ্যমে বাজারে প্রবেশ করছে। তারা এখন শুধু নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি সরবরাহেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না, বরং সার্ভার, ডেটা সংরক্ষণ, ডেটা সেন্টার, ব্যক্তিগত ক্লাউড ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোতেও প্রবেশ করতে চাইছে। এর ফলে প্রতিযোগিতার পরিসর অ্যান্টেনা বা ট্রান্সমিশন সরঞ্জামের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো প্রযুক্তি বাস্তুতন্ত্রে বিস্তৃত হচ্ছে।
একটি তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের মূল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো চীনা প্রযুক্তির উপস্থিতি সীমিত রয়ে গেছে; বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার সমাধানের ওপরই নির্ভরশীল, এবং সার্ভার-নেটওয়ার্ক অবকাঠামোতেও পশ্চিমা প্রযুক্তির দীর্ঘদিনের অবস্থান রয়েছে। তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে টেলিযোগাযোগ খাতে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যেই তুলনামূলক বেশি, এবং একটি বড় চীনা টেলিকম প্রতিষ্ঠান এখন টেলিকমের বাইরে গিয়ে ক্লাউড, ডেটা সেন্টার ও ব্যাংকিং অবকাঠামোর মতো এন্টারপ্রাইজ প্রযুক্তিতেও প্রবেশের চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্যে, এই প্রযুক্তিকে এখন কেবল সাশ্রয়ী বিকল্প নয়, সক্ষমতার বিচারেও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
সেই চীনা প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে তাদের সমন্বিত ডেটা সেন্টার, ভার্চুয়ালাইজেশন এবং ফ্ল্যাশ-ভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যার মাধ্যমে লেনদেন ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশের বাজারে বেশ কিছু চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রবেশ করেছে, যাদের পণ্য ও সেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি দামও তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক। এসব প্রতিষ্ঠান আরও সক্রিয় হলে ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তি ব্যয় কমার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
তবে এই সম্প্রসারণের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তিতে সরাসরি কোনো চীনা কোম্পানি বা প্রযুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা না হলেও, জাতীয় নিরাপত্তা-সংবেদনশীল প্রযুক্তি, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা-সংবেদনশীল প্রযুক্তির বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ, এবং যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির অননুমোদিত পুনঃরপ্তানি বা হস্তান্তর রোধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, দুই পক্ষের যেকোনো একটি যে দেশকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিত করবে, সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ শৃঙ্খলে সেই দেশের সফটওয়্যার নকশা, উন্নয়ন বা সরবরাহে সম্পৃক্ততা সীমিত করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ।
এই শর্তগুলো চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় চীনের একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামটি ২০১৯ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রণ তালিকায় স্থান পেয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়মের আওতাধীন নির্দিষ্ট পণ্য বা প্রযুক্তি সরবরাহের জন্য সাধারণত পূর্বানুমতি নিতে হয়। চলতি বছরের জুনে অনুমতি ছাড়াই নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি সরবরাহের অভিযোগে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অর্থ জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তালিকায় সেই চীনা প্রতিষ্ঠানসহ আরেকটি টেলিকম কোম্পানির নাম এখনো বহাল রয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্র এই নিয়ন্ত্রণের পরিধি আরও বাড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নটি দাম বা প্রযুক্তিগত সুবিধার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তিনি একই সঙ্গে মনে করেন, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা উচিত, কারণ তা সাধারণ ভোক্তাদেরই উপকারে আসে। তাঁর ভাষায়, বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভরতা ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে অতীতের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকলেও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ, যা একটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বিশ্ববাণিজ্যের পথে বাধা তৈরি করছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেশ বা প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংকগুলোকে সব সময়ই সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এবং প্রস্তাব যত লোভনীয়ই হোক, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রযুক্তি বাজারে আগামী দিনে একধরনের দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। একদিকে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া এই বাজারে নিজেদের অবস্থান পাকা করতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার, ক্লাউড, আর্থিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোয় আরও বিনিয়োগ বাড়াতে চাইবে। অন্যদিকে নতুন বাণিজ্য চুক্তির শর্তের কারণে চীনা প্রযুক্তি ক্রয়ের সময় সেই পণ্য বা তার কোনো উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে কিনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আছে কিনা—এসব বিষয়ও এখন থেকে ক্রয় সিদ্ধান্তে বিবেচনায় রাখতে হতে পারে।
সরকারি পর্যায়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের প্রযুক্তি সেবা নিতে সমস্যা হচ্ছে—এমন কোনো বিষয় এখনো তাঁদের নজরে আসেনি এবং এ পর্যন্ত কেউ এ রকম অভিযোগও করেননি। তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
তথ্যপ্রযুক্তি খাত-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা হলো, কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা প্রযুক্তি পরিবেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তৈরি হলে সফটওয়্যার হালনাগাদ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, লাইসেন্স নবায়ন বা কারিগরি সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উপাত্ত দেশের ভেতরে সংরক্ষিত থাকলেও, সেই উপাত্ত পরিচালনার সার্ভার, ক্লাউড বা সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে প্রকৃত প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের দেশের হাতে থাকে না। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিজস্ব ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব অবকাঠামো পরিচালনা, নজরদারি, সাইবার সুরক্ষা এবং জরুরি প্রয়োজনে এক প্রযুক্তি থেকে আরেক প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের সক্ষমতাও দেশের ভেতরে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বিদেশি সরবরাহকারীর নিজস্ব মূল্যায়নের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও নিয়মিত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে, বিশেষ করে ব্যাংক, সরকারি তথ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাত ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর ক্ষেত্রে।
আগামী দিনে এই প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার। একটি জনপ্রিয় চাকরিবিষয়ক প্ল্যাটফর্মের একজন শীর্ষ নির্বাহী মনে করেন, সামনে ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, ই-কমার্স, টেলিযোগাযোগ ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বাড়বে, এবং তখন প্রতিযোগিতা কেবল সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তা ছড়িয়ে পড়বে চিপ, সার্ভার, ডেটা সেন্টার ও মডেল অবকাঠামোর মতো গভীর স্তরেও। তাঁর মতে, তখন কোন দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে এবং বাণিজ্য চুক্তির কোনো শর্ত তাতে বাধা তৈরি করছে কিনা, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে, যদিও এখনই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন। তিনি আরও মনে করেন, নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও সুরক্ষিত রাখা জরুরি, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে উপযুক্ত প্রযুক্তি বেছে নিতে পারে।
একজন সাইবার সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, যিনি একই সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও যুক্ত, মনে করেন বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়বে, তবে দেশের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত উপাত্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, সংবেদনশীল ও কৌশলগত উপাত্ত কোথায় সংরক্ষিত থাকবে, তাতে কার প্রবেশাধিকার থাকবে এবং তার ওপর বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর তৈরি করার সক্ষমতা রাষ্ট্রের থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজার একদিকে যেমন দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তেমনি তা এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার একটি ক্ষুদ্র প্রতিফলনক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক দাম আর সক্ষমতার প্রলোভনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির শর্ত, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞার জটিল বাস্তবতা—যা আগামী দিনে দেশের প্রযুক্তি ক্রয়-সিদ্ধান্তকে আরও সতর্ক ও কৌশলগত করে তুলবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

