প্রযুক্তি বিষয়ক ওয়েবসাইট সিনেট ২৫টি প্রযুক্তির কথা বলছে, যেগুলো পৃথিবীকে বদলে দিতে এখন পর্যন্ত ‘সবচেয়ে বেশি’ অবদান রেখেছে। বিনোদন জগতে একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল ডিভিডি প্লেয়ার আসায়। কিন্তু তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ইউটিউব, নেটফ্লিক্স। দিনে দিনে অনেক প্রযুক্তি বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে।
সিনেটের বিবেচনায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি: র্যানসামওয়্যার, ই-সিগারেট, ভিডিও-কনফারেন্সিং, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, আরএফআইডি, চালকহীন গাড়ি, অ্যাপ, মিউজিক স্ট্রিমিং, ভিডিও স্ট্রিমিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিএনএ টেস্টিং কিট, ড্রোন, এমপি৩ এবং ব্লকচেইন।
থ্রি-ডি প্রিন্টিং: প্রযুক্তি মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, থ্রি-ডি বা ত্রিমাত্রিক প্রিন্টার প্রযুক্তি দেখলে তা সহজে বোঝা যায়। চাইলে এই যন্ত্র দিয়ে ঘরে বসে বন্দুকও বানানো যায়। নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি করা যায়। হঠাৎ ধসে পড়া ভবনের উদ্ধারকাজ আরও সহজ করা যায়। বোয়িং মহাকাশযান, বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরি করা যায়। তালিকাটা লম্বা।
একটি ডিজিটাল ফাইল থেকে ত্রিমাত্রিক নিরেট বস্তু তৈরির প্রক্রিয়াকে মূলত থ্রিডি প্রিন্টিং বলে। নতুন বস্তু তৈরি করতে কম্পিউটারনির্ভর একটি ডিজাইন সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি থ্রিডি ইমেজ তৈরি করা হয়। তারপর প্রিন্টারে পাঠানো হয়। প্রিন্টারটির বিভিন্ন স্তরে তরল, গুঁড়ো, কাগজ বা ধাতব উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি হয় নির্দিষ্ট বস্তুর একটি প্রতিরূপ। এটা এমন প্রযুক্তি যাতে কম্পিউটারের সঙ্গে থ্রিডি প্রিন্টার জুড়ে দিয়ে নানা রকম জটিল আকৃতির বস্তু ঘরে বসেই তৈরি করা যায়। সেই ডিজাইন খুব সহজে অনলাইনে শেয়ারও করা যায়। ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে জিনিসটি তৈরি হয় একটির ওপর আরেকটি অতি পাতলা প্লাস্টিকের স্তর বসিয়ে।
ওয়াইফাই: ওয়াইফাইয়ের মতো ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক সৃষ্টি না হলে মোবাইলে ফেইসবুক ব্যবহার মানুষের জন্য কঠিন হয়ে যেত।
১৯৯৭ সালে এটি তৈরি হয়। ওই বছর থেকেই মানুষ ব্যবহার শুরু করে। গত কয়েক বছরে ওয়াইফাই গতি আরও উন্নত হয়েছে। এখন অধিকাংশ দেশে ভালোই স্পিড থাকে। ওয়াইফাই কতটা জরুরি তা বোঝার জন্য এই লকডাউনের দিনগুলোই যথেষ্ট। একবার চিন্তা করে দেখুন এটি না থাকলে কী হতো।
ইন্টারনেট-ভিত্তিক ডিভাইস: ওয়াইফাই শুধু আমাদের মেইল চেক করার সুবিধাই দেয়নি, এখন নেট ব্যবহার করে হাজার-হাজার ডিভাইস চালানো যায়। আপনার স্মার্টহোমে কখন কী হচ্ছে সেটি কয়েক শ মাইল দূরে বসেও আপনি নজর রাখতে পারেন।
ব্লুটুথ: ১৯৯৯ সাল থেকে সাধারণের কাছে পরিচিতি পাওয়া এই প্রযুক্তি এখন অনেক কাজের কাজি। এর সব থেকে বেশি প্রসার হয় ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত। ব্লুটুথ সমর্থন করে এমন কয়েক লাখ ডিভাইস ওই সময় বাজারে পাওয়া যায়।
ভিপিএন: ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক এমন একটি সার্ভিস যেটি আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে সুরক্ষিত রাখে। এই প্রযুক্তির ফলে অনলাইন দুনিয়ায় সাধারণ মানুষ এখন অনেক নির্ভার।
বিটকয়েন: দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। আনা যায় না ঘরে। রাখা যায় না ব্যাংকে। তবু সেটি মুদ্রা! ইন্টারনেট দুনিয়ায় দিনকে দিন এই মুদ্রার লেনদেন বেড়েই চলেছে। ভার্চুয়াল মুদ্রার এই মার্কেটে বিটকয়েনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। অনেক প্রযুক্তিবিদ এই কয়েন ব্যবহার করে ইন্টারনেটে ব্যবসা করেন।
এটি মূলত ডিজিটাল মানি। অর্থাৎ অনলাইনে আপনার অ্যাকাউন্ট থাকবে, সেই অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল কোডের মাধ্যমে আপনার মুদ্রা সংরক্ষিত থাকবে।
ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেনের জন্য কোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা নেই। ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অনলাইনে দুজন ব্যবহারকারীর মধ্যে সরাসরি (পিয়ার-টু-পিয়ার) আদান-প্রদান হয়। লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয় ক্রিপ্টোগ্রাফি নামের একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির কারণে আপনার লেনদেনের খবর অন্য কেউ জানতে পারে না।
ফেসিয়াল রিকগনিশন: ফেসিয়াল রিকগনিশন হচ্ছে একটি বায়োমেট্রিক পদ্ধতি। চেহারার মাধ্যমে মানুষকে শনাক্ত করতে মূলত এটি কাজ করে। এর কর্মপদ্ধতি বোঝার জন্য ফেইসবুকের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। আপনার বন্ধু তালিকার বাইরে থেকেও কেউ যদি আপনার ছবি পোস্ট দেয়, তাহলে আপনার কাছে একটি নোটিফিকেশন আসে। ছবিতে আপনার মুখের ওপর একটি বক্স আঁকা থাকে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীদের ধরা যেমন সহজ, তেমনি প্রাইভেসির চিন্তাও আছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: এখনকার দিনে অধিকাংশ ডিভাইসে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এটি থাকলে মানুষকে যন্ত্র খুব বেশি অপারেট করতে হয় না। অল্প ব্যবহারে কম সময়ে পাওয়া যায় নির্ভুল ফলাফল। কম্পিউটার প্রযুক্তি থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞান পর্যন্ত এর ব্যবহার ছড়িয়েছে।
কোনো যন্ত্রকে যখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার জন্য বানানো হয়, তখন সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ মানুষের মতো কাজ পেতে যে যন্ত্র তৈরি করা হয় তাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র বলে।
অ্যাপল আইফোন: মোবাইল প্রযুক্তি এতদিন যেসব বিস্ময় সৃষ্টি করেছে অ্যাপলের আইফোন তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রযুক্তিবিদেরা বলে থাকেন, এই ফোনটির সর্বোচ্চ ব্যবহার এখনো করতে পারেনি বিশ্ব।
অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি সানফ্রান্সিসকোতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইফোনের ঘোষণা দেওয়ার ছয় মাস পর বাজারে এসেছিল প্রথম আইফোন।
বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার সময় স্টিভ জবস বলেছিলেন, তিনটি বৈপ্লবিক উদ্ভাবনী পণ্যের সমন্বয় আইফোন। একটি হচ্ছে বৈপ্লবিক মোবাইল ফোন, প্রশস্ত পর্দার স্পর্শ নিয়ন্ত্রণযোগ্য আইপড ও যুগান্তকারী ইন্টারনেট যোগাযোগের যন্ত্র, যাতে ডেস্কটপের মতো মেইল আদান-প্রদান, ওয়েব ব্রাউজ, সার্চ ও ম্যাপ দেখা যায়। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বজুড়ে অ্যাপল-ভক্তদের কাছে বিশ্বস্ত পণ্যের নাম হয়ে উঠেছে আইফোন। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশজুড়ে নতুন আইফোন বাজারে আসা নিয়ে তৈরি হয় চরম উন্মাদনা।
২০১৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তিপণ্যের তালিকায় শীর্ষে চলে আসে আইফোন। ওই সময় শীর্ষ ৫০টি গ্যাজেটসের তালিকা করে টাইম ম্যাগাজিন। ম্যাগাজিনটিতে বলা হয়, কম্পিউটিং ও তথ্যের মধ্যে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি পরিবর্তন করায় আইফোনকে সবচেয়ে প্রভাবশালী পণ্য বলা যায়।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: জটিল সব হিসাব আর সমস্যা সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার।
মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি হানিওয়েল সম্প্রতি এই প্রযুক্তিতে এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করেছে যা ১০ হাজার বছরের হিসাব এক মিনিটেরও কম সময়ে শেষ করতে পারে!
গত বছর অক্টোবরে গুগল নিজেদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির কথা জানায়। গুগলের দাবি, তাদের কম্পিউটার ১০ হাজার বছরের হিসাব দুই মিনিটেরও কম সময়ে করতে পারে।
ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট: ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিভাইস এখন একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের ভয়েস কমান্ড শনাক্তের সক্ষমতা অর্জন করেছে। এর ফলে একেকজনের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে পারে। গত বছর থেকে স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট স্মার্টফোনের পাশাপাশি সব ধরনের প্রযুক্তিপণ্য ছড়িয়ে পড়ছে। স্মার্ট টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, মিডিয়া প্লেয়ার, গাড়ি, ডিজিটাল প্রজেক্টর ও অ্যাকশন ক্যামেরার মতো ডিভাইসে ভার্চুয়াল সহকারী ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রযুক্তির দেখা মিলেছে।

