মহাকাশে স্থাপনযোগ্য সুপারকম্পিউটার নেটওয়ার্ক তৈরিতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে চীন। ‘থ্রি-বডি কম্পিউটিং কনস্টেলেশন’ নামের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের আওতায় দেশটি প্রথম পর্যায়ে ১২টি স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে। এই স্যাটেলাইটগুলোই গড়বে মহাকাশে বিশ্বের প্রথম স্যাটেলাইট-নির্ভর সুপারকম্পিউটার সিস্টেম।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গুআংমিং ডেইলির তথ্য অনুযায়ী, বুধবার জিউকুয়ান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ‘লং মার্চ-২ডি’ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো হয় এসব স্যাটেলাইট। প্রতিটি স্যাটেলাইটে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটিং ক্ষমতা, উচ্চগতির লেজার কমিউনিকেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবস্থা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পুরো কম্পিউটিং নেটওয়ার্ক একসঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার পেটা বা এক কুইন্টিলিয়ন (১০ লাখ ট্রিলিয়ন) কম্পিউটার অপারেশন সম্পন্ন করতে পারবে। এটি বর্তমানের সর্বাধিক শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারদের সঙ্গে পাল্লা দেবে।
প্রতিটি স্যাটেলাইট নিজে থেকেই প্রতি সেকেন্ডে ৭৪৪ ট্রিলিয়ন অপারেশন চালাতে সক্ষম। এসব স্যাটেলাইটের মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ গিগাবিট গতিতে ডেটা আদান-প্রদান সম্ভব। সমগ্র নেটওয়ার্কের সম্মিলিত অপারেশন ক্ষমতা ৫ পেটাফ্লপস এবং স্টোরেজ সুবিধা ৩০ টেরাবাইট।
উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে মহাকাশ থেকে প্রাপ্ত তথ্য পৃথিবীতে এনে বিশ্লেষণ করতে হয়। কিন্তু ডেটা স্টেশন ও ব্যান্ডউইথ সীমাবদ্ধতার কারণে ১০ শতাংশ তথ্যের বেশি বিশ্লেষণের সুযোগ থাকে না।
হার্ভার্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জনাথন ম্যাকডাওয়েল জানান, মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং সিস্টেম সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এই প্রকল্পকে তিনি মহাকাশে নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার “প্রথম বড় পরীক্ষা” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলো এক হাজার টেরাওয়াট ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে- যা জাপানের বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, শুধু শীতলীকরণেই ২০২২ সালে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ২০ বিলিয়ন লিটার পানি।
এই প্রেক্ষাপটেই চীনের মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং উদ্যোগটি স্থলভিত্তিক প্রযুক্তির বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশ সরকারের অধীনে পরিচালিত ‘ঝেজিয়াং ল্যাব’। স্যাটেলাইটের ডিজাইন ও সংযোজন করেছে চেংডু-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গোসিং অ্যারোস্পেস। হাই-স্পিড লেজার টার্মিনাল সরবরাহ করেছে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান হাইস্টারলিংক।
চীনের এই পদক্ষেপ শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকেই নয়, পরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

