ডিজিটাল যুগে পেশাগত পরিচিতি ও প্রচারের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে প্রায় সব পেশাই নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। তবে আইন পেশায় বিজ্ঞাপনের প্রশ্নটি এখনও বিতর্কিত। বাংলাদেশে আইনজীবীদের জন্য সরাসরি বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
কয়েক বছর আগে বলিউড তারকা শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত একটি মামলা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে তিনি জামিন পাওয়ার পর তার আইনজীবী শাহরুখ খান ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। অনেকের কাছে সেটি ছিল একজন আইনজীবীর জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রচারণার উদাহরণ। এই ঘটনা আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন ও আত্মপ্রচারের সীমা কোথায় হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনে।
বাংলাদেশে কী বলে আইন?
বাংলাদেশে আইনজীবীদের পেশাগত বিজ্ঞাপন এবং কাজ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘ক্যাননস অব প্রফেশনাল কন্ডাক্ট অ্যান্ড এটিকেট’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো আইনজীবী সার্কুলার, বিজ্ঞাপন, দালাল, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা অন্যান্য উপায়ে কাজ পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। এই নীতিমালার আইনি ভিত্তি হলো ১৯৭২ সালের ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার’, যার ক্ষমতাবলে আইনজীবীদের জন্য পেশাগত আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো ভারতেও আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার ৩৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞাপন প্রচার করা নিষিদ্ধ। তবে ২০০৮ সালে নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে আইনজীবীরা সীমিত পরিসরে নিজেদের ওয়েবসাইট পরিচালনার সুযোগ পান। সেখানে নাম, যোগাযোগের তথ্য, পেশাগত যোগ্যতা এবং কাজের ক্ষেত্র সম্পর্কে তথ্য দেওয়া যায়। কিন্তু মক্কেলের প্রশংসাপত্র বা নিজের দক্ষতার প্রচার এখনও নিষিদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রে ভিন্ন চিত্র:
আইনজীবীদের বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে উদার বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে বিষয়টি বাণিজ্যিক বাকস্বাধীনতার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
১৯৭৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রেও আইনজীবীদের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ ছিল। তবে ‘বেটস বনাম স্টেট বার অব অ্যারিজোনা’ মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত মত দেয়, আইনজীবীদের বিজ্ঞাপনের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
বর্তমানে আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের নীতিমালা অনুযায়ী আইনজীবীরা টেলিভিশন, বিলবোর্ড, ডাকযোগে প্রচারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। তবে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো বিজ্ঞাপন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হতে পারবে না। একই সঙ্গে আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে বিপন্ন বা দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের সরাসরি লক্ষ্য করে কাজ সংগ্রহের চেষ্টা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের অনেক দেশ কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে এসে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার পথ বেছে নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য পেশার মর্যাদা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

যুক্তরাজ্যে সলিসিটর ও ব্যারিস্টার উভয়েই বিজ্ঞাপন দিতে পারেন। তবে প্রচার হতে হবে সঠিক, বিভ্রান্তিমুক্ত এবং অনধিকারপ্রবেশমূলক নয়। সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি গিয়ে বা অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের মাধ্যমে সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেও একসময় কঠোর বিধিনিষেধ ছিল। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার মতোই কড়াকড়ি দেখা যেত। তবে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং একক বাজার ব্যবস্থার কারণে এসব দেশ ধীরে ধীরে নীতি শিথিল করেছে। বর্তমানে আইনজীবীরা বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, তবে তা হতে হবে সত্যনিষ্ঠ, মর্যাদাপূর্ণ এবং মক্কেলের গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
নতুন বাস্তবতায় কি পরিবর্তন প্রয়োজন?
বাংলাদেশের বর্তমান আইনটি প্রণীত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। তখন যোগাযোগব্যবস্থা ছিল সীমিত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ধারণাই ছিল না। ফলে বর্তমান ডিজিটাল বাস্তবতায় এই আইন কতটা কার্যকর এবং সময়োপযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশের মতো দেশে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতার ঘাটতি থাকায় বিভ্রান্তি ও প্রতারণার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ভারতের মতো দেশও একই কারণে নিয়ন্ত্রিত অবস্থান বজায় রেখেছে।
তবে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে পুরোনো বিধিনিষেধ নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো ছবি, সফল মামলার আলোচিত ঘটনা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর তথ্যপ্রবাহ অনেক সময় প্রচলিত বিজ্ঞাপনের চেয়েও বেশি প্রভাব তৈরি করে। আরিয়ান খানের মামলার পর প্রকাশিত সেই বহুল আলোচিত ছবিটি তারই একটি উদাহরণ।
ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনজীবীদের পেশাগত মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে এবং জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সময়োপযোগী ও প্রগতিশীল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে।

