বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগতভাবে দুটি ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। এর একটি হবে কক্সবাজারের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে এবং অন্যটি চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী আনোয়ারায়। বিষয়টি জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. নাসিমুল গনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দুটি জোন মিলিয়ে প্রায় ৬০০ একর জমি বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। আনোয়ারা অঞ্চলের ফ্রি ট্রেড জোনের উন্নয়নকাজ চলতি বছর শুরু হতে পারে। অন্যদিকে মাতারবাড়ি ফ্রি ট্রেড জোন বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০৩০ থেকে ২০৩৩ সাল। এটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পের সঙ্গে সমন্বয় করে গড়ে তোলা হবে। সরকারের মতে, নতুন এই জোনগুলো বাণিজ্য, লজিস্টিকস ও উৎপাদন খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বিশ্বে ফ্রি ট্রেড জোন মডেল সবচেয়ে সফল বাণিজ্যিক কাঠামোগুলোর একটি। তার ভাষায়, দুবাইয়ের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৩৭ শতাংশই ফ্রি ট্রেড জোন থেকে আসে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জন্যও এমন উদ্যোগ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) থাকলেও প্রস্তাবিত ফ্রি ট্রেড জোনের কার্যক্রম হবে আরও বিস্তৃত। এখানে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু উৎপাদন নয়, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কার্যক্রমও পরিচালনা করতে পারবেন।
আশিক চৌধুরীর মতে, ফ্রি ট্রেড জোনকে “ইপিজেড প্লাস প্লাস” বলা যেতে পারে। কারণ ১৯৮০-এর দশকে চালু হওয়া ইপিজেড ধারণার তুলনায় বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি সুবিধা পাবেন। তবে বিদ্যমান ইপিজেডগুলোও আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
ফ্রি ট্রেড জোনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি কার্যত দেশের শুল্কসীমার বাইরে পরিচালিত হবে। বিনিয়োগকারীরা কোনো শুল্ক ছাড়াই কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারবেন। সেগুলো ব্যবহার করে মূল্য সংযোজনের পর তৈরি পণ্য পুনরায় রপ্তানি করা যাবে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে প্রচলিত শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হবে।
এই মডেলে গুদামজাতকরণ বা ওয়্যারহাউজিংকে প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদেশি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্রি ট্রেড জোনের ভেতরে কাঁচামাল মজুত রাখতে পারবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানিকারক কিংবা আঞ্চলিক ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতে পারবে। বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের আগে শুল্ক পরিশোধ করতে হয় এবং পরে ফেরতের জন্য আবেদন করতে হয়, যা দীর্ঘদিন ধরে জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে সমালোচিত। নতুন ব্যবস্থায় এই জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিডা চেয়ারম্যান বলেন, দেশের কাছাকাছি কাঁচামালের মজুত থাকলে রপ্তানির প্রস্তুতি ও সরবরাহে সময় কম লাগবে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের রপ্তানিকারকদের কাছেও বাংলাদেশ একটি সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা আঞ্চলিক বিতরণকেন্দ্র হিসেবে এসব জোন ব্যবহার করতে আগ্রহী হতে পারে।
বিশ্বের সফল ফ্রি ট্রেড জোনগুলোর মধ্যে দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোন অন্যতম। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এই ধরনের মডেল চালুর ক্ষেত্রে কিছুটা দেরি করলেও এখন তা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার পর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এসব জোনে হালকা শিল্প, লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ, আঞ্চলিক বিতরণকেন্দ্র এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বাড়বে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অর্থনীতি অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার আলোচনা চলছে। তার মতে, এই জোনগুলো শুধু নতুন বিনিয়োগই আকর্ষণ করবে না, বরং শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও একটি কার্যকর বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, মাতারবাড়ি ফ্রি ট্রেড জোন দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে মাতারবাড়ি বড় আকারের জাহাজ গ্রহণে সক্ষম হবে। ফলে পরিবহন ব্যয় কমবে, পণ্য পরিবহনের সময় হ্রাস পাবে এবং বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উৎপাদন ও বিতরণকেন্দ্র বেছে নেওয়ার সময় যেসব বিষয় গুরুত্ব দেয়, মাতারবাড়ি প্রকল্পে সেসব সুবিধার অনেকগুলোই রয়েছে। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বিদ্যমান তিনটি ইপিজেডের কাছাকাছি হওয়ায় আনোয়ারাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে। ব্যবসায়ীরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ভোগ্যপণ্য, প্যাকেজিং শিল্প এবং আঞ্চলিক বিতরণ কার্যক্রমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তিনি অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দ্রুত চার লেন থেকে ১০ লেনে উন্নীত করার আহ্বান জানান।
এদিকে ফ্রি ট্রেড জোন কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের কাজও শুরু হয়েছে। বিডা চেয়ারম্যান জানান, এ উদ্দেশ্যে সাতটি আইন ও বিধিমালার কিছু ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে আগামী বছরের মধ্যেই একটি ফ্রি ট্রেড জোন চালুর চেষ্টা করা হবে।

