দেশে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত চার প্রান্তিকের মধ্যে মার্চ প্রান্তিকেই নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে কম। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিদেশি উদ্যোক্তাদের বাড়তে থাকা সতর্কতারই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগই একটি দেশে একেবারে নতুন বিদেশি পুঁজির প্রবেশ নির্দেশ করে। এই খাতে বড় ধরনের পতন বোঝায়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগে আগের তুলনায় অনেক বেশি অনাগ্রহী হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ঝুঁকি বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করেন, যা নতুন বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রেটিং সংস্থার কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়াও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে। বিনিয়োগের আগে তারা একটি দেশের ঋণমান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মুনাফা সহজে নিজ দেশে নেওয়ার সুযোগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার বিদেশি উদ্যোক্তাদের কাছে দেশের আর্থিক খাত সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ফলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আরও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এরপর জুন প্রান্তিকে তা কমে ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ১০ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং ডিসেম্বরে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সেই প্রবাহ আরও কমে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার ডলারে নেমে এসেছে।
নতুন ইক্যুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ মিলিয়ে মোট এফডিআই প্রবাহও কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে মোট এফডিআই এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার, যেখানে এক বছর আগে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
তবে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এ খাতে বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ডলার।
এই পুনঃবিনিয়োগের কারণে দেশের মোট এফডিআই স্টক ১৮ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে মার্চ শেষে ২১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কেবল পুনঃবিনিয়োগ নয়, নতুন বিদেশি মূলধনের প্রবাহ বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ক্রেডিট রেটিং অবনমন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি পরিবর্তনে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার ঘোষিত ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উপযোগী পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় এখনও বড় বাধা। তার মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও বর্তমানে ধীরগতির। এটি ইঙ্গিত দেয়, দেশীয় উদ্যোক্তারাও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন।
বিদেশি বিনিয়োগে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
‘ইউনক্টাড ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, বড় অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘানা, উগান্ডা ও কঙ্গোর মতো দেশ প্রশাসনিক ও আইনগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকেও দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিতে হবে। অন্যথায় নতুন বিদেশি বিনিয়োগের ধীরগতি অব্যাহত থাকতে পারে।

