বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এখন প্রবাসী আয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি নাগরিক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর একটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী দেশগুলোর একটি।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার শক্তিশালী করে না, বরং দেশের আমদানি সক্ষমতা, গ্রামীণ অর্থনীতি, ভোগব্যয় এবং লাখো পরিবারের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের অনেকেই পরিচিত ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ হিসেবে।
তবে রেমিট্যান্সের প্রতিটি ডলারের পেছনে যে মানুষের গল্প রয়েছে, তা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অর্থনীতির পরিসংখ্যানে উঠে আসে টাকার অঙ্ক, কিন্তু সেই অর্থ উপার্জনের পেছনে থাকা দীর্ঘ সংগ্রাম, বিচ্ছিন্নতা ও ত্যাগের হিসাব খুব কমই সামনে আসে।
বিদেশের কঠিন কর্মপরিবেশে প্রতিদিনের শ্রম, পরিবার থেকে দূরে থাকা, অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রবাসীরা তাঁদের আয় পাঠান দেশে। অনেকের কাছে বিদেশে থাকা মানে শুধু ভালো আয়ের সুযোগ নয়, বরং স্বপ্ন পূরণের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা এবং আপনজনদের থেকে দূরে থাকার কঠিন বাস্তবতা।
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান নিয়ে আলোচনা হয়, তাঁদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ নিয়েও হিসাব করা হয়। কিন্তু অভিবাসনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বুঝতে হলে দেখতে হবে সেই মানুষের জীবনকেও, যাঁদের শ্রম ও ত্যাগে এই অর্থ দেশে আসে। প্রবাসী আয়ের গল্প তাই শুধু অর্থনীতির সাফল্যের গল্প নয়। এটি লাখো মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, বিচ্ছেদ এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার এক মানবিক কাহিনিও।
রেমিট্যান্সের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিক মূল্য:
অভিবাসন শুধু একটি দেশের অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ বাড়ায় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের নানা পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অভিবাসনের সামাজিক মূল্য’। অর্থাৎ বিদেশে গিয়ে আয় বাড়লেও এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সন্তান প্রতিপালন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক ভূমিকা এবং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।
অভিবাসন গবেষক হাইন ডে হাস দেখিয়েছেন, অভিবাসনকে শুধু উন্নয়নের সাফল্য কিংবা কেবল সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়, তেমনি থাকে নানা ত্যাগ ও চ্যালেঞ্জ। একইভাবে অভিবাসন বিশ্লেষক স্টিফেন ক্যাসলস মনে করেন, অভিবাসন কেবল একজন ব্যক্তির এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া নয়; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপরও।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবাসী আয় নিয়ে আলোচনা যতটা বিস্তৃত, অভিবাসনের সামাজিক মূল্য নিয়ে আলোচনা ততটা নয়। আমরা রেমিট্যান্সের পরিমাণ হিসাব করি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এর প্রভাব দেখি, কিন্তু এই অর্থ অর্জনের পেছনে থাকা মানুষের বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, পারিবারিক দূরত্ব ও ব্যক্তিগত ত্যাগের হিসাব খুব কমই সামনে আসে।
অভিবাসনের এই কঠিন বাস্তবতার একটি বেদনাদায়ক দিক দেখা যায় প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে ৪ হাজার ৮১৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার অভিবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। তাঁদের বড় অংশই ছিলেন ৪০ বছরের কম বয়সী কর্মক্ষম তরুণ।
এই পরিসংখ্যান শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্ন। যাঁরা পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ফিরে আসেননি। তাঁদের পাঠানো অর্থ হয়তো দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতির মূল্য বহন করতে হয়েছে পরিবারকে।
রেমিট্যান্সের বড় অঙ্কের আড়ালে তাই রয়েছে অনেক অদেখা গল্প—দীর্ঘ অপেক্ষা, একাকিত্ব, অপূর্ণ স্বপ্ন এবং সম্পর্কের দূরত্ব। একজন প্রবাসীর পাঠানো প্রতিটি অর্থের সঙ্গে শুধু শ্রম নয়, জড়িয়ে থাকে তাঁর সময়, অনুভূতি ও জীবনের একটি অংশ। সাম্প্রতিক এক সামাজিক গবেষণায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের এমন কিছু অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে, যা অভিবাসনের মানবিক দিককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। সেই গল্পগুলোই তুলে ধরা হবে পরবর্তী অংশে।
দূরত্ব যখন বদলে দেয় সম্পর্কের সমীকরণ:
প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতাগুলোর একটি হলো দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। অনেক প্রবাসী কর্মী টানা ৫, ৭ এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকেন। অনেকের পক্ষে বছরে একবার ছুটিতেও দেশে ফেরা সম্ভব হয় না। দীর্ঘ এই অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবারের আবেগ ও সম্পর্কের কাঠামোতে পরিবর্তন আনে।
সন্তান বড় হয় বাবার সরাসরি সান্নিধ্য ছাড়াই। সংসারের অধিকাংশ দায়িত্ব একাই সামলাতে হয় স্ত্রীকে। আবার বৃদ্ধ মা-বাবার অসুস্থতা কিংবা জীবনের কঠিন সময়ে ছেলের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকে ফোনের কথোপকথনে। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দেখা হয় ভিডিও কলে, কিন্তু কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ থাকে না।
অনেক পরিবার অবশ্য ভালোবাসা, ধৈর্য ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে এই দূরত্ব সামলে নেয়। তবে সব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি একই থাকে না। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের ঘাটতি, মানসিক একাকিত্ব এবং সামাজিক চাপ কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে। দাম্পত্য সম্পর্কে তৈরি হতে পারে দূরত্ব ও অবিশ্বাস। কখনো বাইরের মানুষের হস্তক্ষেপেও জটিলতা বাড়ে।
তবে এসব ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিনের শারীরিক অনুপস্থিতি, মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত যোগাযোগের অভাব এবং পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার মতো সামাজিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ হিসাব করেছি। এখন সময় এসেছে সেই রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষের জীবনকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
বাবা যখন শুধু অর্থের উৎস হয়ে ওঠেন:
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বাবা-মায়ের উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বহু প্রবাসী বাবার সন্তান বেড়ে ওঠে বাবার সরাসরি সান্নিধ্য ছাড়াই।
এই সন্তানেরা জানে, বাবা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান। কিন্তু বাবার সঙ্গে প্রতিদিনের কথোপকথন, ছোট ছোট স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া কিংবা আবেগের বন্ধন তৈরির সুযোগ অনেকেরই হয় না। ফলে ধীরে ধীরে কিছু সন্তানের কাছে বাবা একজন অভিভাবকের চেয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক ভরসায় পরিণত হন।
সন্তান অনেক সময় বাবার সংগ্রাম, কষ্ট ও ত্যাগের গভীরতা বুঝতে পারে না। কোনো চাহিদা পূরণ না হলে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে, অথচ সেই অর্থের পেছনে বাবার দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পরিশ্রম ও ত্যাগের গল্প অজানাই থেকে যায়। প্রবাসী বাবা নিয়মিত অর্থ পাঠাতে পারেন, কিন্তু সন্তানের স্কুলে প্রথম দিন, অসুস্থতার সময় পাশে থাকা, কৈশোরের নানা সংকট কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো সরাসরি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না। এই অনুপস্থিতি ধীরে ধীরে বাবা-সন্তানের সম্পর্কের ভাষা বদলে দিতে পারে। অনেক সন্তান বাবাকে ভালোবাসে, কিন্তু বাবার জীবনসংগ্রাম ও ব্যক্তিত্বকে কাছ থেকে জানার সুযোগ পায় না।
এর প্রভাব পড়ে পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশেও। সন্তানের পড়াশোনা, মূল্যবোধ গঠন, সামাজিক আচরণ এবং জীবনের সিদ্ধান্তে বাবার সরাসরি ভূমিকা অনেক সময় সীমিত হয়ে যায়। ফলে দিকনির্দেশনা, শাসন এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই প্রবাসী পরিবারের এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন—অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি কীভাবে প্রবাসী পরিবারগুলোর মানসিক ও সামাজিক বন্ধনও শক্তিশালী রাখা যায়।
অসীম প্রত্যাশার চাপে নুয়ে পড়া প্রবাসী জীবন:
বাংলাদেশের সমাজে এখনো একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—বিদেশে গেলেই জীবনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসে। এই ধারণার কারণে অনেক প্রবাসী কর্মীর আয়কে ঘিরে পরিবারের প্রত্যাশা ক্রমেই বাড়তে থাকে। বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা, ব্যবসায় বিনিয়োগ, সন্তানের পড়াশোনা, আত্মীয়ের চিকিৎসা কিংবা বিয়ের খরচ—সব দায়িত্ব যেন শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে একজন প্রবাসীর কাঁধে।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক সীমিত আয়ের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালান। অনেকেই ছোট কক্ষে একাধিক মানুষের সঙ্গে থাকেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে দীর্ঘ সময় কাজ করেন এবং নিজের চাহিদা কমিয়ে পরিবারের জন্য বেশি অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করেন।
অনেক সময় নিজের চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগও তাঁদের হয় না। বিদেশে চাকরি হারানো, বেতন আটকে যাওয়া, কর্মস্থলের অনিশ্চয়তা কিংবা অসুস্থতার মতো সমস্যাও তাঁদের জীবনের অংশ। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন ভালোবাসা ও দায়িত্বের জায়গা থেকে প্রত্যাশা ধীরে ধীরে অধিকারবোধে পরিণত হয়। একজন প্রবাসী পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অর্থ পাঠান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থকে ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রকাশ হিসেবে না দেখে পরিবারের একটি স্বাভাবিক পাওনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফলে কোনো মাসে অর্থ পাঠাতে দেরি হলে তৈরি হয় অভিযোগ, অভিমান কিংবা মানসিক চাপ। অথচ অনেক সময় এর পেছনে থাকতে পারে কাজের সংকট, বেতন আটকে যাওয়া কিংবা প্রবাসীর নিজের অসুস্থতা। অতিরিক্ত প্রত্যাশা তাই একজন প্রবাসীর ওপর শুধু আর্থিক চাপই তৈরি করে না, তৈরি করে গভীর মানসিক চাপও।
আমাদের ভাবতে হবে—প্রবাসীদের কাছ থেকে আমরা কতটা আশা করি এবং তাঁদের জন্য কতটা সহায়তা তৈরি করি। একজন প্রবাসী শুধু অর্থ পাঠানোর মাধ্যম নন; তিনি একজন মানুষ। তাঁর শ্রমের যেমন মূল্য রয়েছে, তেমনি মূল্য রয়েছে তাঁর অনুভূতি, সম্পর্ক ও জীবনের। আমরা বহু বছর ধরে রেমিট্যান্সের হিসাব করেছি। এখন সময় এসেছে সেই রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষটির জীবনকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
সম্পদের সঙ্গে বাড়ে সম্পত্তি নিয়ে সংকট:
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের একটি বড় অংশ বিনিয়োগ হয় জমি কেনা কিংবা বাড়ি নির্মাণে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার আশায় তাঁরা বছরের পর বছর পরিশ্রম করে এই সম্পদ গড়ে তোলেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই সম্পত্তিই পরবর্তী সময়ে বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এর অন্যতম কারণ হলো, সম্পত্তির মালিক বেশির ভাগ সময় দেশে না থাকা। এই অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কখনো জমি দখল, কাগজপত্রে জটিলতা, সীমানা নিয়ে বিরোধ, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা আইনি সমস্যার সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এসব বিরোধের পেছনে অনেক সময় থাকেন না কোনো অপরিচিত ব্যক্তি। বরং নিকটাত্মীয়দের সঙ্গেই তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। কখনো ভাই, কখনো চাচা বা চাচাতো ভাই, আবার কখনো অন্য কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়তে হয় প্রবাসীদের।
তখন একজন প্রবাসীকে একসঙ্গে দুটি সংগ্রাম করতে হয়—একটি বিদেশের কর্মক্ষেত্রে, অন্যটি নিজের দেশের মাটিতে। বিদেশে বসে আদালতের মামলা পরিচালনা করা, আইনজীবীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করে অর্জন করা সম্পদ নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। অনেক প্রবাসী দেশে ফিরে দেখেন, যে সম্পত্তির জন্য তাঁরা বছরের পর বছর বিদেশে কষ্ট করেছেন, সেই সম্পত্তিই এখন পারিবারিক বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রবাসীদের অদৃশ্য মানসিক চাপ:
প্রবাসী শ্রমিকদের শারীরিক পরিশ্রমের কথা বলা হলেও তাঁদের মানসিক অবস্থার বিষয়টি খুব কমই আলোচনায় আসে। অনেক প্রবাসী নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারেন না। তাঁরা পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না, আবার কর্মস্থলেও ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলার সুযোগ সীমিত থাকে। দীর্ঘ একাকিত্ব, পরিবার থেকে দূরত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক প্রবাসীর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
সমাজে এখনো একটি ধারণা রয়েছে—বিদেশে থাকা মানেই ভালো থাকা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন। অনেক প্রবাসী প্রতিদিন উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা এবং একাকিত্বের সঙ্গে লড়াই করে কাজ করেন। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ তাঁদের ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং সম্পর্কের দূরত্বের মতো সমস্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় অভিবাসী শ্রমিকদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য এখনো নীতিনির্ধারণের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। প্রবাসীদের অবদান শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের শ্রম, ত্যাগ, মানসিক সংগ্রাম এবং মানবিক মূল্যও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
সমাধানের পথ কোথায়?
একজন মানুষকে বিদেশে পাঠানোই রাষ্ট্রের দায়িত্বের শেষ নয়; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও বড় দায়িত্ব। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তাঁদের পাঠানো অর্থের পাশাপাশি তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক সুস্থতাও সুরক্ষিত থাকবে।
প্রবাসীদের সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতির বিষয়। যাঁদের শ্রম ও আয়ে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়, তাঁদের জীবনমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।
এ জন্য বিদেশগামী কর্মীদের প্রস্তুতি শুধু ভাষা শেখানো বা পেশাগত দক্ষতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্যও সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন। প্রবাসীর আয় ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক সম্পর্ক ধরে রাখা, সন্তান প্রতিপালন, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং মানসিক সহায়তার বিষয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
পাশাপাশি প্রবাসীদের সম্পত্তি সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রুত আইনি সহায়তা, সহজ ডিজিটাল সেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও শক্তিশালী করা দরকার। কারণ, একজন প্রবাসী শুধু অর্থ পাঠান না; তিনি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে নিজের জীবন ও স্বপ্নও যুক্ত করেন। সবশেষে আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা দরকার—প্রবাসীদের কাছ থেকে আমরা কতটা নিচ্ছি, আর তাঁদের জন্য কতটা ফিরিয়ে দিচ্ছি?
একজন প্রবাসী শুধু রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যম নন; তিনি একজন মানুষ। তাঁর শ্রমের যেমন মূল্য রয়েছে, তেমনি মূল্য রয়েছে তাঁর অনুভূতি, সম্পর্ক এবং জীবনের। আমরা বহু বছর ধরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ হিসাব করেছি। এখন সময় এসেছে সেই রেমিট্যান্সের পেছনে থাকা মানুষটির জীবনকেও হিসাবের মধ্যে আনার।
কারণ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নয়, সেই রিজার্ভ তৈরিতে অবদান রাখা মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান ও সুস্থতার মধ্যেও নিহিত।

