আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব এবার সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বাজারে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
চলতি বছরের এপ্রিল ও মে—মাত্র দুই মাসে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রল বিক্রি করে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এই অর্থকে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অর্থ বিভাগের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে ডিজেল বিক্রি থেকে। দুই মাসে শুধু ডিজেলেই সম্ভাব্য লোকসান হয়েছে ৭ হাজার ১৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে অকটেনে ২০৩ কোটি ৬২ লাখ এবং পেট্রলে ২৩৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা লোকসানের হিসাব করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, পরিস্থিতি মাসে মাসে আরও কঠিন হয়েছে। এপ্রিল মাসে তিন ধরনের জ্বালানি তেল বিক্রিতে সম্ভাব্য লোকসান ছিল ২ হাজার ২৭০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। মে মাসে সেই লোকসান এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩৪০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সম্ভাব্য লোকসান বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৭০ কোটি টাকা।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ জ্বালানি তেলের প্রকৃত ব্যয় এবং ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়া খুচরা দামের মধ্যে বড় ব্যবধান। গত ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় সেই সমন্বয় বিপিসির ব্যয় পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি।
এপ্রিলের হিসাবটি আরও পরিষ্কার করে দেখলে পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা যায়। মাসের প্রথম ১৮ দিন ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রতি লিটার ১০০ টাকা দরে। অথচ গড় ব্যয় অনুযায়ী দাম ছিল ১৫৫ টাকা ৬ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিটি লিটারে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ছিল ৫৫ টাকা ৬ পয়সা। ওই ১৮ দিনে ডিজেল বিক্রি থেকে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৬ কোটি ৮ লাখ টাকা।
১৯ এপ্রিল দাম সমন্বয়ের পর ডিজেলের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়। কিন্তু তখনও গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৫৫ টাকা ৫০ পয়সা। ফলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান কমে ৩৮ টাকা ৫০ পয়সায় এলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ১৯ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ দিনে এ খাতে সম্ভাব্য লোকসান হয় ৬৭৭ কোটি ৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসে ডিজেল বিক্রি থেকে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
অকটেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। এপ্রিলের প্রথম ১৮ দিনে প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা দরে বিক্রি করা হলেও গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৪৩ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে প্রতিলিটারে লোকসান হয় ২৩ টাকা ৯০ পয়সা। এই সময়ে সম্ভাব্য লোকসান ছিল ৭৭ কোটি টাকার বেশি।
১৯ এপ্রিল মূল্য সমন্বয়ের পর অকটেনের দাম বেড়ে হয় ১৪০ টাকা। এতে লোকসানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৪৬ টাকা ৮৮ পয়সা। ফলে প্রতিলিটারে লোকসান দাঁড়ায় ৬ টাকা ৮৮ পয়সা। ১২ দিনে সম্ভাব্য লোকসান হয় প্রায় ১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসে অকটেন বিক্রিতে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ৯১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
পেট্রলের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা ছিল। এপ্রিলের প্রথম ১৮ দিনে প্রতি লিটার পেট্রল বিক্রি হয়েছে ১১৬ টাকা দরে। বিপরীতে গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৩৯ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে প্রতিলিটারে লোকসান হয়েছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা এবং ১৮ দিনে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
১৯ এপ্রিলের পর পেট্রলের দাম বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হলেও গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৪২ টাকা ৮৮ পয়সা। ফলে প্রতিলিটারে লোকসান কমে ৭ টাকা ৮৮ পয়সায় নামে। ১২ দিনে সম্ভাব্য লোকসান হয় ১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এপ্রিল মাসে পেট্রল বিক্রিতে মোট সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ১০৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
এভাবে এপ্রিল মাসে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রল মিলিয়ে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ২ হাজার ২৭০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় পুরো চাপই এসেছে ডিজেল থেকে।
কিন্তু মে মাসে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ওই মাসে জ্বালানি তেলের খুচরা দাম আর বাড়ানো হয়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় এবং আমদানি-সংশ্লিষ্ট খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিক্রয়মূল্য ও প্রকৃত ব্যয়ের ব্যবধান আরও বড় হয়।
মে মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের খুচরা মূল্য ছিল ১১৫ টাকা। অথচ গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য দাঁড়ায় ২২৭ টাকা ৪৯ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিলিটারে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ১১২ টাকা ৪৯ পয়সা। দৈনিক হিসাবে লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। পুরো মে মাসে ডিজেল বিক্রিতে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
অকটেনেও লোকসানের চাপ ছিল। মে মাসে প্রতি লিটার অকটেন ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করা হলেও গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৬০ টাকা ১৫ পয়সা। প্রতিলিটারে লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ১৫ পয়সা। মাস শেষে এ খাতে সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
পেট্রলের ক্ষেত্রেও বিক্রয়মূল্য ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতি লিটার পেট্রল ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ১৫৬ টাকা ১৫ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিলিটারে লোকসান হয়েছে ২১ টাকা ১৫ পয়সা। মে মাসে পেট্রল বিক্রি থেকে সম্ভাব্য লোকসান হয়েছে ১৩১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
ফলে মে মাসে তিন ধরনের জ্বালানি তেল বিক্রিতে মোট সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩৪০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিজেলের অংশই ৫ হাজার ৯৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিলের ১৯ তারিখে দাম সমন্বয়ের পর প্রতিলিটার জ্বালানি তেলে লোকসান কমেছিল। ডিজেলের ক্ষেত্রে লোকসান ৫৫ টাকা ৬ পয়সা থেকে কমে ৩৮ টাকা ৫০ পয়সায় নেমেছিল। অকটেনে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে কমে হয়েছিল ৬ টাকা ৮৮ পয়সা এবং পেট্রলে ২৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে কমে হয়েছিল ৭ টাকা ৮৮ পয়সা।
কিন্তু মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই স্বস্তি আর থাকেনি। বিশেষ করে ডিজেলের ক্ষেত্রে ব্যবধান ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ১১৫ টাকা দরে বিক্রি হওয়া প্রতি লিটার ডিজেলের বিপরীতে গড় ব্যয় অনুযায়ী মূল্য ছিল ২২৭ টাকা ৪৯ পয়সা। অর্থাৎ প্রতিলিটারে ১১২ টাকা ৪৯ পয়সা ঘাটতি থেকেই গেছে।
এই পরিস্থিতি শুধু বিপিসির হিসাবের খাতায় লোকসান বাড়াচ্ছে না, বরং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও নতুন চাপ তৈরি করছে। কারণ বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হলে বিক্রয়মূল্য কম রাখার ফলে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, সেটি শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থ থেকেই পূরণ করতে হবে।
আবার হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়িয়ে দিলে এর প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচ, পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। বিশেষ করে ডিজেল পরিবহন ও কৃষি খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘ সময় অনিশ্চিত থাকে, তাহলে শুধু এককালীন ভর্তুকি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে। তখন জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ, আমদানি ব্যয়, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ভর্তুকি নীতিকে আরও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দুই মাসের হিসাব তাই কেবল বিপিসির লোকসানের পরিমাণ দেখাচ্ছে না; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্য ব্যবস্থাপনার সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জও তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার পুরো চাপ ভোক্তার ওপর দেওয়া সম্ভব নয়। আবার দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কম দামে জ্বালানি বিক্রি করাও সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই ভর্তুকির চাপ কতটা বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা কে বহন করবে। কারণ এপ্রিল ও মে মাসেই যেখানে সম্ভাব্য লোকসান ৭ হাজার ৬১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে, সেখানে পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে সামনে এই ব্যয় আরও বড় অঙ্কে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

