আজ ৫ আগস্ট। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক। ২০২৪ সালের এই দিনেই ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মত্যাগ স্মরণে আজ সারাদেশে পালিত হচ্ছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে সরকার রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা এবং নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে দিনটি পালন করা হচ্ছে।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জুলাইয়ের সেই আন্দোলন নিয়ে আলোচনা এখনো থেমে নেই। কেউ একে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, কেউ বর্ষা বিপ্লব, আবার কেউ জুলাই বিপ্লব নামে অভিহিত করেন। নাম ভিন্ন হলেও অধিকাংশের মতে, এটি ছিল এমন একটি গণআন্দোলন যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেই কারণেই আন্দোলনটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন গণঅংশগ্রহণ ও তার ফলাফল খুব কমই দেখা গেছে। তাদের মতে, শত শত মানুষের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিশ্ব গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও সে সময় বাংলাদেশের পরিস্থিতির দিকে নিবিড় নজর রেখেছিল।
দিবসটি উপলক্ষে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে মহান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। তিনি এটিকে ছাত্র-জনতার বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন দেশে আর কোনো ধরনের স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান না ঘটে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম, আর ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল সেই স্বাধীনতার চেতনা ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। তিনি আন্দোলনে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, রাষ্ট্র তাদের আত্মত্যাগ কখনো ভুলবে না।
তবে দিবসটির আবেগঘন পরিবেশের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসছে। আন্দোলনের সময় যারা জীবন দিয়েছেন কিংবা আহত হয়েছেন, তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? সমাজের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক অনুষ্ঠানে বলেন, জুলাইয়ের চেতনার পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আন্দোলনের আদর্শ বাস্তবায়নে সবাইকে নৈতিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে বৈষম্য, শোষণ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, এই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রামের চেতনা অব্যাহত থাকবে।
দিবসটি উপলক্ষে সারাদেশে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করবেন। বেলা ১১টায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। একই ধরনের অনুষ্ঠান দেশের বিভিন্ন জেলাতেও অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর বিশেষ কর্মসূচি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সরকারি ও বেসরকারি জাদুঘরগুলো আজ সাধারণ মানুষের জন্য বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশু পরিবার, পুনর্বাসন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশের জনপ্রিয় কয়েকটি সংগীতদল ও শিল্পীরা অংশ নেবেন।
এদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নিজ নিজ কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে।
দুই বছর পর এসে স্পষ্টভাবে বলা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গণঅংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। তবে এই আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়—সেই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্ধারণ করবে।

