আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বেছে নিয়েছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত করেছেন। আগামী ১২ আগস্ট এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম সামনে আসায় আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ একই দিনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকবেন কি না এবং সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে মির্জা ফখরুল বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্বের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও রয়েছেন।
এর আগে গত ১ আগস্ট বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন মির্জা ফখরুল নিজেই। তিনি জানিয়েছিলেন, দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচন এবং নির্বাচন কবে হবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় বিএনপির সক্রিয়তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিএনপি দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি এবং দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ১১ দলীয় জোটও নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে অবস্থিত বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় ওই বৈঠক শুরু হয়েছিল।
ফলে একই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি এবং ১১ দলীয় জোটের অবস্থান এখন আলাদা হয়ে গেল। বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ১২ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করে এবং ১১ দলীয় জোট অলি আহমদের প্রার্থিতা বহাল রাখে, তাহলে নির্বাচনে একাধিক প্রার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ নির্বাচনের মতো সরাসরি জনগণের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন। তাই শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী কতটা সমর্থন পাচ্ছেন, সেটিই হবে নির্বাচনের মূল বিষয়। প্রার্থীদের মনোনয়নেও সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, আগ্রহী প্রার্থীরা ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে সংসদ সদস্য থাকতে হবে। একই প্রার্থী চাইলে একাধিক মনোনয়নপত্রও জমা দিতে পারবেন। তবে যাচাই-বাছাইয়ের পর একটি মনোনয়নপত্রই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত যদি একজন বৈধ প্রার্থী থাকেন, তাহলে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। আর একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আগামী ২০ আগস্ট সংসদ অধিবেশন কক্ষে এই ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদটি শূন্য হওয়ার পর থেকেই নতুন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একই সময়ে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে ২০ আগস্টের ভোটের দিনটি এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা হিসেবে সামনে এসেছে।
এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণার পর ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো সমঝোতার চেষ্টা হবে কি না। একই সঙ্গে অলি আহমদের প্রার্থিতা বহাল থাকবে, নাকি শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে—সেটিও নজর রাখার মতো বিষয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতার পরিবর্তনের মতো সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিএনপির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুলের নাম সামনে আসা এবং ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অলি আহমদের নাম ঘোষণা—দুই ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা—দুই সম্ভাবনাই এখন সক্রিয় রয়েছে।
আগামী ১২ আগস্ট বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে মির্জা ফখরুলের নাম ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। এরপর ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা, ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ধাপ পেরিয়ে ২০ আগস্ট চূড়ান্তভাবে জানা যাবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন।

