সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও আধুনিক করতে একটি একক ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল জনসেবা অবকাঠামো তৈরির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এমন একটি আধুনিক ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করতে কাজ করছে, যেখানে একটি মাত্র ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে নাগরিকরা বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানের পর তিনি জানান, আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এই ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও উন্নত ডিজিটাল জনসেবা অবকাঠামো এবং পরিচয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এই উদ্যোগ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং এর জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
ডিজিটাল জনসেবা অবকাঠামো বলতে এমন একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে পরিচয় যাচাই, অর্থ পরিশোধ এবং বিভিন্ন সরকারি তথ্য বিনিময়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা একটি অভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নাগরিক সেবা দ্রুত, সহজ এবং স্বচ্ছ করতে এ ধরনের ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে চাচ্ছে।
নিরাপদ তথ্য বিনিময়ে নতুন কাঠামো
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এই ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে। এ ক্ষেত্রে এস্তোনিয়ার এক্স-রোড মডেল অনুসরণ করার বিষয়েও কাজ চলছে।
এক্স-রোড হলো এমন একটি নিরাপদ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য একে অপরের সঙ্গে নিরাপদভাবে বিনিময় করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য যদি একটি নিরাপদ কাঠামোর মাধ্যমে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে নাগরিকদের একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে সরকারি সেবা প্রদানের সময়ও কমে আসবে।
তবে এমন একটি ব্যবস্থা সফল করতে হলে তথ্যের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নাগরিকদের আস্থা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল পরিচয়ের বিস্তার
জাতিসংঘের প্রযুক্তি বিষয়ক দূতের কার্যালয় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির যৌথ আয়োজনে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ডিজিটাল জনসেবা অবকাঠামোর উন্নয়ন ও পরিচালনা নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, তথ্য নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
এই আয়োজনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে একমাত্র বাংলাদেশই আলোচক হিসেবে অংশ নেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বর্তমানে নিজেদের নাগরিক সেবাকে ডিজিটাল করার জন্য নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরিতে একসঙ্গে কাজ করছে।
রুয়ান্ডা সরকারি সেবা গ্রহণ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও এমন একটি ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নাগরিকরা বিভিন্ন দেশে নিজেদের পরিচয় যাচাই এবং ডিজিটাল নথি ব্যবহার করতে পারবেন।
ভবিষ্যতের সরকারি সেবায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ভবিষ্যতে সরকারি সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে ডিজিটাল জনসেবা অবকাঠামো এবং ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা।
একটি একক ডিজিটাল পরিচয় চালু হলে নাগরিকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ হতে পারে। জন্মনিবন্ধন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সরকারি কার্যক্রমে তথ্য যাচাইয়ের সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্য সুরক্ষা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, বরং নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা এবং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা গ্রহণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একাধিক পরিচয় ও আলাদা আলাদা প্রক্রিয়ার পরিবর্তে একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে নাগরিকরা আরও দ্রুত ও সহজে সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

