আজ ২৪ সেপ্টেম্বর, মীনা দিবস। কন্যাশিশুর শিক্ষা ও অধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠা এই দিনটি প্রতিবছর দেশে পালিত হলেও বাস্তবতা বলছে, বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্যের কারণে এখনও বহু মেয়ের শিক্ষাজীবন মাঝপথে থমকে যাচ্ছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের চেয়ে বেশ এগিয়ে।
রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে বসবাস করা দুই কিশোরীর জীবনকাহিনি এই বাস্তবতার একটি ছোট প্রতিচ্ছবি। কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে আসা এক কিশোরী জানায়, সৎ মায়ের নির্যাতনের কারণে বোনের সঙ্গে পালিয়ে সে স্টেশনে চলে আসে। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকায় স্কুল থেকে তার নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল। তার সঙ্গী, হবিগঞ্জ থেকে আসা আরেক কিশোরী প্রায় এক বছর ধরে স্টেশনেই থাকছে। দ্বিতীয় শ্রেণির পর তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায়, যদিও সেখানে আসার পর পথশিশুদের জন্য পরিচালিত একটি শিক্ষা কার্যক্রমে কিছুদিন যুক্ত ছিল সে। মুঠোফোনে মীনা কার্টুন দেখার অভিজ্ঞতা থেকে সে মীনা ও রাজু নামের দুটি চরিত্রের কথা জানায়, যা শুনে তার সঙ্গীর মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়—মীনা আসলে কে। উত্তরে জানা যায়, মীনা ও রাজু কার্টুনের দুটি চরিত্র, যারা স্কুলে যায়, এবং পরদিন পথশিশু সংগঠনের কেন্দ্রে গিয়ে তা দেখানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মীনা চরিত্রটির জন্ম নব্বইয়ের দশকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও শিক্ষাবঞ্চনার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এই ধারাবাহিক অ্যানিমেশন তৈরি করে। নয় বছর বয়সী মীনা শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে এগিয়ে যায়—এই বার্তাই কার্টুনটির মূল সুর। এর জনপ্রিয়তা বিবেচনায় ১৯৯৮ সালে ২৪ সেপ্টেম্বরকে আনুষ্ঠানিকভাবে মীনা দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম পর্ব সম্প্রচারিত হওয়ার পর কার্টুনটি রেডিও নাটক ও কমিক বইয়ের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বাইরে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের শিশুদের কাছেও মীনা পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে, যা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে লিঙ্গসমতা, শিশু অধিকার ও শিক্ষার বার্তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষার সাফল্যগাথার আরেকটি দিক দেখা যায় তিন বোনের গল্পে। বড় বোন স্নাতকোত্তর পড়াশোনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত, মেজ বোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সবচেয়ে ছোট বোন দশম শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি বিদেশে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা লাভের স্বপ্ন দেখছেন। এই পরিবারের অভিজ্ঞতা মূলধারার শিক্ষাপরিসংখ্যানের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় স্পষ্টভাবে বেশি। ২০২৪ সালের হিসাবে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের নিট ভর্তির হার ছিল ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের হার ৬২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও একই ধারা লক্ষ করা যায়—মেয়েদের ভর্তির হার ৪৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং ছেলেদের ৪৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে এই এগিয়ে থাকার চিত্র কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় গিয়ে উল্টে যায়। ভোকেশনাল, ডিপ্লোমা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছেলেদের অংশগ্রহণ বেশি দেখা যায়—২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের মোট ভর্তির হার ছিল ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই ব্যবধান নির্দেশ করে, মাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়ার পর মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এখনও বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা কাজ করছে।
এই প্রতিবন্ধকতার সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসে বাল্যবিবাহ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর যৌথ জরিপ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সম্পন্ন হয়েছে, এবং ১৩ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। ২০১৯ সালের জরিপের তুলনায় এই হার কিছুটা কমলেও, বাস্তবতা হলো এখনও প্রতি দুই নারীর মধ্যে একজনের বিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই হয়ে যাচ্ছে।
কমলাপুর স্টেশনে থাকা ময়মনসিংহের এক কিশোরীর জীবনও এই পরিসংখ্যানের বাস্তব রূপ। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার মৃত্যুর পর তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, এবং চৌদ্দ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। স্বামীর প্রথম সংসারের এক শিশুর দেখাশোনার দায়িত্বও তার ওপর এসে পড়ে। শাশুড়ির নির্যাতন ও স্বামীর জুয়ার নেশার কারণে শেষমেশ মায়ের সঙ্গে ঢাকায় ফিরে আসে সে। ছোটবেলায় মীনা কার্টুন দেখে বড় হয়ে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই কিশোরী এখনও আশা করে, বাবাকে বুঝিয়ে একদিন আবার স্কুলে ফেরা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মীনা দিবসের প্রেক্ষাপটে সামনে আসা এই পরিসংখ্যান ও জীবনচিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের অগ্রগতি প্রশংসনীয় হলেও বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য ও পারিবারিক সহিংসতার মতো কাঠামোগত সমস্যা এখনও অসংখ্য কিশোরীর শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। উচ্চশিক্ষায় ছেলে-মেয়ের ব্যবধান কমাতে এবং ঝরে পড়া কিশোরীদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।

